হামে মৃত্যুর রেকর্ড: চলতি বছরে সর্বোচ্চ, বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে চলতি বছরে মৃত্যুর সংখ্যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ দিনে (১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল) ৯৮ শিশু সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে, যার মধ্যে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৬। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে চারজন এবং নিশ্চিত হামে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
মৃত্যুর হার বৃদ্ধি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়মিতভাবে গণনা করা হলেও মৃত্যুর হার ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। বর্তমানে হামে মৃত্যুর হার ১০ লাখে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগে ১ শতাংশ ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদের মতে, "আমি যতটুকু অনুমান করতে পারি, দেশে হামে এ পর্যন্ত এক বছরের মধ্যে এত রোগীর মৃত্যু হয়নি।"
গত ২০ দিনে ৮২৬ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালে দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪১০ জন, কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে তা ৪০০-এর নিচে নেমে এসেছিল।
টিকাদানের ঘাটতি ও অতীতের তুলনা
টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম জানান, ২০১৬ সালে হামে একজনের মৃত্যু হয়েছিল, ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১০ ত্রিপুরা শিশুর মৃত্যু ঘটে, এবং ২০১৮ সালে হাটহাজারীতে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়। ২০২০ সালে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল, কিন্তু তারপর থেকে এত ব্যাপক মৃত্যুর রেকর্ড নেই।
২০০৬ সালে আইইডিসিআরের একটি জরিপে মাত্র চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, এবারের মৃত্যুর সংখ্যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা ও টিকাদান কর্মসূচি
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে ৯ হাজার ৭৪৩টি হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল, যা ২০০৫ সালে বেড়ে ২৫ হাজার ৯৩৪-এ পৌঁছায়। এরপর আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও ২০১৬ সালে আবার বৃদ্ধি পায়। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ১৯৭৯ সালে শুরু হয় এবং বর্তমানে ৮৪ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় রয়েছে।
ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির প্রধান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, "গত বছর আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। হামের টিকা দেওয়া হয়নি পর্যাপ্ত। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। সেখান থেকে পিছিয়ে গেল দেশ।" বিশেষজ্ঞরা চলতি বছর হাম বৃদ্ধির পেছনে ২০২৫ সালে টিকাদানের নিম্নহারকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অব্যাহত রয়েছে, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হচ্ছে।



