২০৪০ সালে বিশ্বে স্থূল শিশুর সংখ্যা ২২ কোটির বেশি হতে পারে, বাংলাদেশে ৪৩ লাখ
২০৪০ সালে বিশ্বে স্থূল শিশুর সংখ্যা ২২ কোটির বেশি হতে পারে

বিশ্বজুড়ে শিশু স্থূলতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, ২০৪০ সালে ২২ কোটির বেশি শিশু আক্রান্ত হতে পারে

বিশ্বব্যাপী শিশুদের মধ্যে স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা ভয়াবহ গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি ফেডারেশন তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে সতর্ক করে দিয়েছে যে, যদি এখনই কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ২০৪০ সালের মধ্যে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় ২২ কোটি ৭০ লাখ শিশু স্থূলতায় আক্রান্ত হবে। মোট অতিরিক্ত ওজনধারী শিশুর সংখ্যা অর্ধশত কোটিরও বেশি ছাড়িয়ে যাবে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

২০২৬ সালের বিশ্ব স্থূলতা অ্যাটলাসের ভয়াবহ পূর্বাভাস

সংস্থাটির ২০২৬ সালের বিশ্ব স্থূলতা অ্যাটলাসে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ১৮ কোটি শিশু স্থূল ছিল। কিন্তু বর্তমানের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দেড় দশকের মধ্যে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উচ্চ বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) এর কারণে অন্তত ১২ কোটি স্কুলপড়ুয়া শিশুর শরীরে দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেবে।

বিএমআই সূচক অনুযায়ী:

  • বিএমআই ৩০ বা তার বেশি হলে ব্যক্তিকে স্থূল হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়
  • বিএমআই ২৫-এর বেশি হলে তাকে অতিরিক্ত ওজনধারী বলা হয়

কোন দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি শিশু স্থূলতায় আক্রান্ত?

প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, উচ্চ বিএমআই আছে এমন ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে চীন ও ভারত। চীনে এই সংখ্যা ৬ কোটি ২০ লাখ এবং ভারতে ৪ কোটি ১০ লাখ। তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ শিশুর বিএমআই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এই পরিসংখ্যানের অর্থ দাঁড়ায় যে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে দুজনই অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত।

বাংলাদেশের অবস্থা উদ্বেগজনক

বাংলাদেশে শিশু স্থূলতার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী:

  1. ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখ ৬৫ হাজার
  2. ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই সংখ্যা ৩২ লাখ ৪৮ হাজার

সর্বমোট ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় ৪৩ লাখের বেশি বাংলাদেশি শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভুগছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি তৈরি করেছে।

ইউরোপে যুক্তরাজ্যের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ

যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩৮ লাখ শিশুর উচ্চ বিএমআই রয়েছে, যা ইউরোপের মধ্যে অন্যতম খারাপ অবস্থান নির্দেশ করে। দেশটিতে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূল শিশুদের সংখ্যা ফ্রান্স ও ইতালির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার শিশুর মধ্যে হৃদরোগের লক্ষণ দেখা যেতে পারে এবং প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার শিশুর উচ্চ রক্তচাপের উপসর্গ ধরা পড়তে পারে।

কেন দ্রুত বাড়ছে শিশু স্থূলতা?

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, শিশু স্থূলতা বৃদ্ধির পেছনে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সমস্যা নয়, বরং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও দায়ী। যে ১০টি দেশে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মোট সংখ্যার অর্ধেকের বেশি অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত, সেগুলোর বেশির ভাগই পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও আমেরিকা মহাদেশে অবস্থিত। তবে সবচেয়ে দ্রুত হারে স্থূলতা বাড়ছে বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, যেখানে:

  • পুষ্টিকর খাবারের অভাব রয়েছে
  • সস্তা জাঙ্ক ফুড সহজলভ্য হয়ে উঠেছে
  • শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলার সুযোগ সীমিত

কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?

ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি ফেডারেশনের প্রতিবেদন সরকারগুলোর প্রতি কয়েকটি জরুরি আহ্বান জানিয়েছে:

  1. চিনিযুক্ত পানীয় ও খাবারে কর আরোপ করা
  2. জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করা
  3. খাদ্য প্যাকেটের সামনের দিকে স্পষ্ট পুষ্টি-তথ্য লেবেল বাধ্যতামূলক করা
  4. শিশুদের জন্য বেশি খেলাধুলা ও সক্রিয় জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করা

বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, "শিশু স্থূলতা থাকবে এটা স্বাভাবিক নয়।" কিন্তু এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৪০ সালের প্রজন্ম হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ভার নিয়ে বড় হবে, যা সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করবে।