জাতীয় সাংবাদিক কর্মশালায় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কারের জোর দাবি
বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নিম্নহার নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন ব্যবস্থাপনাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। বিদ্যমান জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কার করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা এখন জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্মশালায় উঠে আসা চিত্র
বুধবার (৪ মার্চ) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন: অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালায় এসব মতামত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) সংস্থা এই কর্মশালার আয়োজন করে।
৩ ও ৪ মার্চ অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন এবং অনলাইন মিডিয়ায় কর্মরত মোট ৩২ জন সাংবাদিক সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। এছাড়াও প্রজ্ঞা’র কর্মসূচি প্রধান হাসান শাহরিয়ার এবং কো-অর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বিষয়ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
নিবন্ধনের বর্তমান হারের উদ্বেগজনক চিত্র
বর্তমানে দেশে জন্ম নিবন্ধনের হার মাত্র ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশে অবস্থান করছে। এই পরিসংখ্যানের অর্থ দাঁড়ায়, প্রতিদিন হাজারো মানুষ জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ করলেও তাদের প্রায় অর্ধেকই রাষ্ট্রীয় নথিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ কার্যত রাষ্ট্রের হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য মারাত্মক সমস্যা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নাগরিকের আইনি পরিচয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, উত্তরাধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। নিবন্ধনবিহীন নাগরিকরা বাস্তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অদৃশ্য হয়ে পড়েন, যা শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, মানবপাচার ও বৈষম্যের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
আইনি সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা
বিদ্যমান আইনে নিবন্ধনের দায়িত্ব প্রধানত পরিবারের ওপর বর্তায়, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর এই দায়িত্ব বাধ্যতামূলক করা হয়নি। অথচ বর্তমানে দেশে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ শিশুর জন্ম স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে। স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক জন্মই নিবন্ধনের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে প্রায় শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে মনে করছেন, বাংলাদেশেও একই ধরনের সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
বক্তাদের মূল বক্তব্য
ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস’র কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, "শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অর্জনে বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী করার পাশাপাশি আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।"
জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, "স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিবন্ধনের দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে জাতিসংঘের আঞ্চলিক সংস্থা ইউএনএসকাপ’র শতভাগ নিবন্ধন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি এসডিজি ১৬.৯, সবার জন্য বৈধ পরিচয়পত্র অর্জন সম্ভব হবে।"
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’র ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান তার পর্যবেক্ষণে বলেন, "জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কার যাতে জাতীয় অগ্রাধিকার পায়, সেজন্য নিবন্ধনের বহুমুখী প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ তৈরি করতে হবে।"
সম্ভাব্য সমাধানের পথ
কর্মশালায় উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা নিম্নলিখিত সমাধান পথগুলোর উপর জোর দিয়েছেন:
- স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা
- বিদ্যমান জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন দ্রুত সংস্কার করা
- নিবন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা
- প্রশাসনিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন করা
এই কর্মশালার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের বর্তমান নিম্নহার কেবল পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়, বরং এটি নাগরিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় উন্নয়নের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ভরযোগ্য জন্ম ও মৃত্যুর তথ্যের অভাবে কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে।
