২০২১ সালে কিছু গবেষক ট্যাটু আঁকা ত্বকের ক্ষুদ্র নমুনা পরীক্ষা করছিলেন। তাঁরা দেখলেন, ট্যাটুর কালি শুধু ত্বকের ওপরেই থেমে থাকে না। কণাগুলো আরও গভীরে চলে যায়, একদম ত্বকের নিচের টিস্যু ফ্যাসিয়া পর্যন্ত। ত্বকের নিচের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফাঁকা জায়গা দিয়ে এগুলো একদম ভেতরে চলে গেছে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক নিল থাইস এটি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এই গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক। পরে তিনি বলেছিলেন, 'এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।' কারণ, ত্বক এবং এর নিচের ফ্যাসিয়ার মধ্যে এভাবে সরাসরি সংযোগ আছে, এমন ধারণা আগে ছিল না। এটি জানার পর প্রচলিত শারীরবিদ্যার ধারণাই বদলে গেল।
শরীরের অঙ্গসংযোগের নতুন ধারণা
বিস্ময়ের বিষয় হলো, পেটের ভেতরে বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যেও এমন অজানা ক্ষুদ্র সংযোগের খোঁজ পাওয়া গেছে। গত এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা জানতেন, ত্বকের ভেতরে, নিচে এবং শরীরের অঙ্গগুলোর চারপাশে ক্ষুদ্র ফাঁকা জায়গা আছে। কিন্তু শত শত বছর ধরে সেগুলোকে আলাদা আলাদা জায়গা হিসেবেই ভাবা হতো।
নিল থাইস ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথম এই ফাঁকা জায়গাগুলোর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছিলেন ২০১৮ সালে। পরে ২০২১ সালে উল্কির কালি নিয়ে গবেষণা করলেন তাঁরা। সেখান থেকে জানা গেল, এসব ক্ষুদ্র ফাঁকা জায়গা আসলে বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো পুরো দেহের মধ্যে জালের মতো যুক্ত হয়ে ছড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা এই ব্যবস্থাকে বলেন ইন্টারস্টিটিয়াম।
তৃতীয় তরলসংবহন ব্যবস্থা
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক রেবেকা ওয়েলস বলেছেন, 'দেখা যাচ্ছে, এটি শরীরে তরল চলাচলের তৃতীয় একটি ব্যবস্থা।' মানে রক্তসংবহন ও লসিকাতন্ত্রের পাশাপাশি শরীরে আরও একটি চলাচলব্যবস্থা হিসেবে এটি কাজ করছে।
মানবদেহের অঙ্গগুলোকে এখন আলাদা আলাদা না মনে করে একটি জালের মতো ব্যবস্থা হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এই নতুন ব্যবস্থার প্রভাব আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা শরীর নিয়ে আমাদের ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
ইন্টারস্টিটিয়ামের গঠন
প্রায় ৪০০ বছর ধরে শারীরতত্ত্ববিদেরা জানতেন, শরীরে কোষ, খনিজ লবণ, পুষ্টি ও হরমোন পরিবহনের জন্য দুটি বড় ব্যবস্থা আছে। লসিকাতন্ত্র ও রক্তসংবহনতন্ত্র। ১৬২২ সালে ইতালীয় চিকিৎসক গাসপারে আসেল্লি একটি কুকুরের দেহ কেটে পরীক্ষা করার সময় লসিকাতন্ত্রের অস্তিত্ব লক্ষ করেছিলেন। আর ১৬২৮ সালে ইংরেজ চিকিৎসক ও শারীরবিদ উইলিয়াম হার্ভে প্রথম ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে হৃৎপিণ্ড ধমনি, কৈশিকনালি ও শিরার মধ্য দিয়ে রক্ত পাম্প করে।
এর অনেক পরে মার্কিন শারীরতত্ত্ববিদ ও প্যাথলজিস্ট ফ্র্যাঙ্কলিন মল দেখিয়েছিলেন, মানবদেহের ভেতরের অঙ্গ, স্নায়ু, রক্তনালি, হাড় ও পেশিকে ঘিরে একটি আঁশযুক্ত সংযোজক টিস্যু রয়েছে। এটাই ফ্যাসিয়া। এটাও ১০০ বছর আগের ঘটনা। ফ্যাসিয়া শরীরকে ঠিক সেভাবেই ধরে রাখে, যেভাবে একটি বাড়ির দেয়ালের ভেতরের কাঠামো ঘরগুলোকে ধরে রাখে।
ইন্টারস্টিটিয়ামের ভেতরের কাঠামো
আগে ধারণা ছিল, এই কাঠামোর ভেতরের ফাঁকা জায়গাগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত নয়। নিল থাইস ও রেবেকা ওয়েলসের গবেষণাই প্রথম দেখাল, এগুলো আসলে শরীরজুড়ে বিস্তৃত এক নেটওয়ার্ক। দেহের মধ্যে জালের মতো যুক্ত হয়ে ছড়িয়ে থাকা এই ব্যবস্থার নাম ইন্টারস্টিটিয়াম। ইন্টারস্টিটিয়ামের ভেতরটাকে কল্পনা করা যায় জেলির ভেতরে ডুবে থাকা মুরগির খাঁচার তারের জাল হিসেবে।
এই তারের জাল হলো কোলাজেন নামে একটি প্রোটিন। ইন্টারস্টিটিয়ামের ভেতরে কোলাজেনের আঁশ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, যা শরীরের কাঠামোকে দৃঢ়তা দেয়। আর জেলির মতো স্পঞ্জি অংশটি তৈরি হয় হায়ালুরোনিক অ্যাসিড দিয়ে। এটি পানি শোষণ করতে পারে এবং পানি ধরে রাখতে পারে। এই জেলির মধ্য দিয়েই তরল, কোষ ও নানা অণু ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়। এই নতুন ধারণা অনুযায়ী, শরীরের ক্ষুদ্র ফাঁকা জায়গাগুলো আসলে একটি বড় জালের অংশ। সেই জালের মধ্য দিয়ে তরল প্রবাহিত হয়ে আবার ফিরে যায় লসিকাতন্ত্র ও রক্তসংবহন ব্যবস্থায়।
প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতির সাথে মিল
নিল থাইস, রেবেকা ওয়েলস ও তাঁদের সহকর্মীরা এই আবিষ্কারের জন্য বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিলেন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ডেভিড মেরিক বলেছিলেন, 'গবেষণাটি সত্যিই খুব বড় ছিল।'
তবে সংযোজক টিস্যুর ভেতর দিয়ে শরীরে তরল চলাচলের ধারণা কিছু প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতিতেও পাওয়া যায়। প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতিগুলোতেও বহু আগে থেকেই এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে, শুধু তখন অণুবীক্ষণযন্ত্র ছিল না। ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে নিল থাইস বলেছিলেন, চীনের একটি সম্মেলনে তাঁর বক্তৃতা শোনার পর প্রাচীন চীনা চিকিৎসাবিদ্যার একজন বিশেষজ্ঞ তাঁকে বলেছিলেন, 'আমরা তো চার হাজার বছর ধরেই এ নিয়ে কথা বলছি।'
আকুপাংচারের সাথে সম্পর্ক
বর্তমানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গবেষণার একটি ক্ষেত্র হলো ইন্টারস্টিটিয়ামের সঙ্গে আকুপাংচারের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা যাচাই করে দেখা। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, মাইগ্রেন, ঋতুভিত্তিক অ্যালার্জি কিংবা কেমোথেরাপিজনিত বমিভাব কমাতে আকুপাংচার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এটি কীভাবে কাজ করে, তার সব ব্যাখ্যা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
ইন্টারস্টিটিয়ামের আবিষ্কার হয়তো আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভাষায় সেই রহস্যের কিছুটা ব্যাখ্যা দিতে পারে। ইন্টারস্টিটিয়ামের সম্পূর্ণ গুরুত্ব বুঝতে এখনো অনেক গবেষণা প্রয়োজন। তবে এরই মধ্যে কিছু আশা দেখা যাচ্ছে।
ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় সম্ভাবনা
গবেষক ডেভিড মেরিকের প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ওজন বাড়লে শরীরের চর্বির চারপাশের ইন্টারস্টিটিয়ামে থাকা বিশেষ কিছু কোষ নতুন স্বাস্থ্যকর চর্বিকোষ তৈরি করতে পারে। এই স্বাস্থ্যকর চর্বিকোষ টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি এই বিশেষ কোষগুলোকে আরও বেশি স্বাস্থ্যকর চর্বিকোষ তৈরির দিকে ঠেলে দেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির পথ খুলে যেতে পারে।
অন্ত্রের রোগের সাথে সংযোগ
গবেষক রেবেকা ওয়েলস একজন পাকস্থলী ও অন্ত্ররোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেছেন, ইন্টারস্টিটিয়ামের সংযোগ হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারে, কেন অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগে আক্রান্ত কিছু রোগীর পিত্তনালিতেও অটোইমিউন রোগ দেখা দেয়। ধারণা করা হয়, অন্ত্র থেকে যেসব রোগপ্রতিরোধক কোষ, ব্যাকটেরিয়া বা ব্যাকটেরিয়ার অংশ যকৃতে পৌঁছায়, সেগুলো ইন্টারস্টিটিয়ামের পথ ধরে পিত্তনালিতে চলে যেতে পারে।
ক্যানসার ছড়ানোর পথ
ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রেও ইন্টারস্টিটিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আগেই জানতেন, ক্যানসার কোষ লসিকাতন্ত্র ব্যবহার করে শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এখন প্রমাণ মিলছে, টিউমারের কোষ হয়তো প্রথমে ইন্টারস্টিটিয়ামের তরলপ্রবাহের ভেতর দিয়ে এগিয়ে পরে লসিকাতন্ত্রে পৌঁছায়।
নিল থাইসের মতে, স্তন, ফুসফুস, কোলন, অগ্ন্যাশয় ও ত্বকের ক্যানসারসহ বহু ধরনের ক্যানসারকে ইন্টারস্টিটিয়ামের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। এই সময় এরা হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ভেঙে সামনে আগায়।
ওষুধের মাধ্যমে বাধা
নারমাফোটিনিব নামে একটি ওষুধ টিউমার কোষের ইন্টারস্টিটিয়ামের ভেতর চলাচল বাধাগ্রস্ত করে। অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের প্রাথমিক পরীক্ষায় এটি আশা করার মতো ফলাফল দেখিয়েছে। এটি কেমোথেরাপির সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছিল।
প্রকৃতিতে ইন্টারস্টিটিয়ামের অস্তিত্ব
ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী হাইড্রার শরীরেও মেসোগ্লিয়া নামে তরলভরা সংযোজক টিস্যু আছে। ইন্টারস্টিটিয়ামের মতো এটিতেও কোলাজেন ও জেলির মতো পদার্থ রয়েছে। এমনকি উদ্ভিদের মধ্যেও ইন্টারস্টিটিয়ামের মতো একটি ব্যবস্থা আছে বলে মনে করা হয়, যাকে বলা হয় অ্যাপোপ্লাস্ট। এটি কোষঝিল্লির বাইরে পানি ও পুষ্টি পরিবহন করে।
শরীরে তৃতীয় এই তরলসংবহন ব্যবস্থার আবিষ্কার হয়তো মানবদেহ সম্পর্কে আগের ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দেবে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস



