স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইপিআই কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বুধবার (৬ মে) সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় ইপিআই কার্যক্রমে ব্যবহৃত হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা এবং ওরাল পোলিও ভ্যাকসিনের (ওপিভি) চালান গ্রহণ শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
ইপিআই কর্মসূচির সাফল্য
মন্ত্রী জানান, ১৯৭৯ সাল থেকে ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১২টি প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি সফল কর্মসূচি এবং গ্যাভি বাংলাদেশকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ইপিআই কর্মসূচি প্রতি বছর প্রায় এক লাখ শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করে এবং প্রায় ৫০ লাখ রোগের সংক্রমণ ঠেকায়।
পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের সমালোচনা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তে এ কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমান সরকার ইপিআইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কারণ এটি শিশুদের জীবন রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তিনি জানান, পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে ভ্যাকসিন ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মধ্যে তা বাতিল করে ইউনিসেফের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করেছে।
হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন
নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি রোগের প্রাদুর্ভাব বিবেচনায় বিশেষ ক্যাম্পেইনও পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী ‘হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা নির্ধারিত সময়ের আগেই ৫ এপ্রিল শুরু করা সম্ভব হয়েছে ইউনিসেফের সহযোগিতায়। এ জন্য তিনি রানা ফ্লাওয়ার্সকে ধন্যবাদ জানান।
ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও সরবরাহ
মন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে ইউনিসেফকে ৮৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছে, যার মাধ্যমে ১০ ধরনের ৯৫ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা হচ্ছে। ৯ ও ১৭ এপ্রিল অর্থ ছাড়ের পর ৩ মে প্রথম চালানে ১৫ লাখ পাঁচ হাজার ডোজ আইপিভি ভ্যাকসিন আসে। ৬ মে আরও ১৫ লাখ ডোজ এমআর ও টিডি (৯০ হাজার ভায়াল) ভ্যাকসিন দেশে পৌঁছেছে। আগামী ১০ মে’র মধ্যে আরও প্রায় এক দশমিক আট কোটি ডোজ এমআর, টিডি, বিসিজি, টিসিভি, বি-ওপিভি ও পেন্টা ভ্যাকসিন দেশে আসবে। ইউনিসেফ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এর মধ্যে সম্পূর্ণ সরবরাহ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ওপেন টেন্ডার বাতিলের পর অতিরিক্ত ৩৫ মিলিয়ন ডলারের ভ্যাকসিনও ইউনিসেফের মাধ্যমে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১৫ মাসের ভ্যাকসিন সংগ্রহ পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে তিন মাসের বাফার স্টক থাকবে। বর্তমানে দেশে টিসিভি ও এইচপিভি ভ্যাকসিনের দুই বছরের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। নতুন সরবরাহের ফলে আগামী ৮ থেকে ১২ মাস অন্য ভ্যাকসিনেও কোনো ঘাটতি থাকবে না।
গুণগত মান ও কভারেজ
মন্ত্রী বলেন, ভ্যাকসিন সংগ্রহ একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সরকার এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশ্বমানের কোল্ড চেইনের মাধ্যমে উৎপাদন থেকে মাঠপর্যায়ে ভ্যাকসিনের গুণগত মান বজায় রাখা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় ইউনিসেফ কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে মাইক্রোপ্ল্যানিং, প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং।
তিনি জানান, চলমান ‘হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এ ৫ মে পর্যন্ত এক কোটি ৬৮ লাখ ২১ হাজার ৬০৫ জন শিশু টিকা পেয়েছে এবং ৯৩ শতাংশ কভারেজ অর্জিত হয়েছে। শতভাগ কভারেজ অর্জনের লক্ষ্যেই কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।



