ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় গত দুই মাসে ২৬ শিশু-কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় মুক্তাগাছা থানায় ২৬টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন অভিভাবকরা। পুলিশ বলছে, এর মধ্যে ২২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে কিংবা বাড়ি ফিরেছে। সোমবার বিকাল পর্যন্ত নিখোঁজ আছে চার জন; তাও প্রেমঘঠিত। তবে স্বজনদের দাবি, পুলিশের তথ্য সঠিক নয়। নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেশি।
নিখোঁজের ঘটনায় আতঙ্ক
একের পর এক শিশু-কিশোর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় অভিভাবকদের মাঝে উদ্বেগ-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, এসব ঘটনায় পাচারকারী চক্র জড়িত থাকতে পারে।
জান্নাতের সন্ধান নেই
উপজেলার কামারিয়া গ্রামের তিন বছরের শিশু জান্নাত আক্তার গত ১৮ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ী বৈশাখী মেলা থেকে নিখোঁজ হয়। পরদিন মুক্তাগাছা ও মধুপুর থানায় জিডি করা হয়। স্বজনরা জানান, জান্নাত তার দাদি ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে গিয়েছিল। ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে ভিড়ের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের পেছন থেকে হারিয়ে যায়। কিন্তু ১৬ দিনেও তার খোঁজ না পেয়ে বাবা জুলহাস মিয়া গলায় সন্তানের ছবি ঝুলিয়ে বাজারে বাজারে ঘুরছেন। প্রতিদিন মানুষের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন সন্তানকে কেউ দেখেছে কিনা। তার এই অসহায়ত্ব স্থানীয়দের মনেও নাড়া দিয়েছে। এখন পর্যন্ত মেয়ের সন্ধান মেলেনি।
জান্নাতের মা শান্তি বেগম বলেন, ‘এখনও আমার মেয়েকে খুঁজে পাইনি। বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে বেড়াচ্ছি। এখন পর্যন্ত পুলিশ আমাদের সন্তানের কোনও সন্ধান দিতে পারেনি। জানি না কোথায় আছে। পুলিশ নিখোঁজদের নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। পুলিশ বলছে চার জনের নিখোঁজ প্রেমঘটিত, তাহলে আমার তিন বছরের মেয়েটি কোথায়? সেটি তো আর প্রেমঘটিত নয়।’
অন্যান্য নিখোঁজের ঘটনা
গত ১৭ এপ্রিল উপজেলার কুতুবপুর এলাকা থেকে ৯ বছর বয়সী সিয়াম নিখোঁজ হয়। তার বাবা কুদ্দুস আলী জানান, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেও এখনও তাকে পাওয়া যায়নি। ২৫ এপ্রিল কালীবাড়ি এলাকার ১৫ বছরের রিয়াজুল বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। ২৭ এপ্রিল রাতে বাড়ি ফিরে আসে। স্বজনরা জানান, কেন সে বাড়ি ছেড়েছিল, তা তারা এখনও বুঝতে পারেননি। সেও বলেনি।
থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চ মাস থেকে নিখোঁজের ঘটনা বাড়তে শুরু করে। এ পর্যন্ত ২৬টি জিডি করা হয়েছে থানায়। পুলিশের দাবি, এর মধ্যে ২২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। চার জন প্রেমঘটিত কারণে নিখোঁজ আছে। তবে স্বজনরা বলছেন, পুলিশের দাবি সঠিক নয়। নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেশি। এর মধ্যে তিন বছরের শিশু জান্নাতের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি।
পাচার চক্রের আশঙ্কা
গত ৭ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়া ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ঢাকা থেকে উদ্ধার করেছিল পুলিশ। তার পরিবারের দাবি, একটি চক্র তাকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ভারতে পাচারের চেষ্টা করেছিল। উদ্ধার হওয়া কিশোরী জানায়, তাকে কৌশলে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া কুতুবপুর গ্রাম থেকে আট বছর বয়সী এক শিশু ১৬ এপ্রিল বাড়ির পাশ থেকে নিখোঁজ হয়। একইভাবে ২৬ এপ্রিল মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে দড়িকাটবাওলা গ্রামের দুই কিশোর নিখোঁজ হয়। ২৪ এপ্রিল বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নয় বছর বয়সী আরেক শিশুরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাদেরও সন্ধান মেলেনি।
স্থানীয়দের উদ্বেগ
একের পর এক শিশু নিখোঁজের ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সচেতন লোকজন বলছেন, বিষয়টি উদ্বেগজনক। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। মুক্তাগাছা পৌর এলাকার বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন, ‘একই এলাকায় স্বল্প সময়ে একাধিক শিশু-কিশোর নিখোঁজ হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে। বাজার, মেলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ জনসমাগমস্থলে নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।’ স্থানীয় ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম সবুজ বলেন, ‘নিখোঁজের এসব ঘটনা শুধু পরিবারের জন্য নয়, সমাজের জন্যই অশনিসংকেত। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির জানান, অল্প সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এত শিশু নিখোঁজ হওয়া উদ্বেগজনক। এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সম্ভাব্য সংগঠিত অপরাধের ইঙ্গিত হতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য
মুক্তাগাছা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জুলুস খান পাঠান বলেন, ‘নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। সম্ভাব্য সব জায়গায় অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। বেশিরভাগই নিখোঁজ শিশু ফিরে এসেছে। এখানে কোনও চক্র কিংবা পাচারকারীর সংশ্লিষ্টতা পুলিশ পায়নি। বেশিরভাগই অভিমান কিংবা রাগ করে বাড়ি ছেড়েছে, আবার ফিরেছে। বাকি আছে নিখোঁজ চার জন, তাদের উদ্ধারের বিষয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।’ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কিশোরীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রেমঘটিত কারণে স্বেচ্ছায় চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে ছেলে নিখোঁজের বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’
মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মার্চ ও এপ্রিল দুই মাস মিলে শিশু-কিশোর নিখোঁজের ঘটনায় ২৬টি জিডি করা হয়েছিল থানায়। এর মধ্যে ২২ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে। কাউকে উদ্ধার করা হয়েছে, কেউ নিজে থেকে বাড়ি ফিরে এসেছে। বাকি চার জন প্রেমঘটিত কারণে বাড়ি ছেড়েছে। এজন্য এখনও তারা বাড়ি ফেরেনি।’ তবে তিন বছরের শিশু জান্নাতের নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনও মন্তব্য করেননি ওসি।



