চট্টগ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। গত তিন মাস যাবৎ ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্তও ওষুধ পায়নি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। এতে প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠী সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ওষুধ সরবরাহ বন্ধের কারণ
সংশ্লিষ্টরা জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রসূতিসেবা, টিকাদানসহ নানা স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। কিন্তু সরকারি ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অপারেশন প্ল্যান পরিবর্তনের কারণে সবকিছু গুছিয়ে উঠতে সময় লাগছে। আমাদের ওষুধের স্বল্পতা আছে।’
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘অনেক দিন যাবৎ কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে ওষুধ সরবরাহ দেওয়া হবে বলে জানতে পেরেছি। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত হতো। এখন কমিউনিটি ক্লিনিকের আলাদা ট্রাস্ট করা হয়েছে। ট্রাস্টের আওতায় এখন পরিচালিত হবে। ফলে ব্যবস্থাপনা আলাদা হওয়ার কারণে সবকিছু ব্যবস্থাপনা করতে গিয়ে ওষুধ সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।’
লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ওষুধের সংকট রয়েছে। তিন মাস পরপর ওষুধ সরবরাহ দেওয়া হয়। আশা করি শিগগিরই ওষুধ পাওয়া যাবে।’
কমিউনিটি ক্লিনিকের বর্তমান অবস্থা
চট্টগ্রাম জেলায় ৫২৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিকে একজন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, একজন স্বাস্থ্য সহকারী ও একজন পরিবার পরিকল্পনা সরকারী কর্মরত রয়েছেন। আবার কোথাও কোথাও এনজিওকর্মীরা কাজ করছেন। একসময় ২৭ ক্যাটাগরির ওষুধ সরবরাহ দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে ২২ ক্যাটাগরির ওষুধ সরবরাহ রয়েছে। সম্প্রতি ডায়াবেটিক ও উচ্চ রক্তচাপের একটি করে ওষুধ সরবরাহ চালু করা হয়। অনেক কেন্দ্রে নরমাল ডেলিভারি হচ্ছে। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ওষুধ সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সেবাগ্রহীতারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
ওষুধ বিতরণ প্রক্রিয়া
জানা যায়, ঢাকায় অবস্থিত কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রধান কার্যালয় থেকে তিন মাস অন্তর ওষুধ বিতরণ করা হয়। ওষুধগুলো ঢাকা থেকে সরাসরি উপজেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো ওষুধ সরবরাহ পায়। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর প্রধান হিসেবে কর্মরত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার ‘সিএইচসিপি’কে সরকারিভাবে তিন মাসের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা রোগীর শারীরিক অবস্থা দেখে উপজেলা সদর হাসপাতালে রেফার করে থাকেন।
কমিউনিটি ক্লিনিকের পটভূমি
কমিউনিটি ক্লিনিক পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পরিচালিত একটি স্বাস্থ্যসেবা। সব কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে উঠেছে জনগণের দান করা জমিতে। সরকার ভবন নির্মাণ, সেবাদানকারী নিয়োগ, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় যাবতীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সরবরাহ করছে। কমিউনিটি ক্লিনিক শুরু হতেই স্বাস্থ্যসেবার মূলধারার সঙ্গে সমন্বয় রেখে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে গ্রামীণ দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মূলত জনগণের অংশগ্রহণে গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা পৌঁছে দেওয়াই ছিল লক্ষ্য। জনমুখী এ কার্যক্রম ১৯৯৬ সালে গৃহীত হলেও বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। বর্তমানে দেশে ১৪ হাজার ৪২৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৪ হাজার ৩৬৩টি চালু রয়েছে।
কর্মীদের বেতন বকেয়া
এদিকে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে কর্মরতদের গত ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। এখনো পর্যন্ত তারা বকেয়া বেতন পাননি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।



