কনিকা আক্তার নামের এক নারী গত ৭ এপ্রিল ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের মেঝেতে শুয়ে কাঁদছিলেন এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বামী মোহাম্মদ জাকির। তাঁর মুখ শোকে ম্লান। নিজের বুক চাপড়ে তিনি হাম ওয়ার্ডের একটি বিছানায় শুয়ে থাকা তাঁদের ৬ মাস বয়সী মেয়ে রুহির দিকে ইশারা করে বলছিলেন, ‘সে দেখতে একদম তার (মৃত বোন) মতো। তাকে আমি কীভাবে কবর দেব?’
রুহির যমজ বোন রিসা ওই দিন সকালেই হামে মারা গেছে। এখন রুহিকে সেই একই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) বিছানায় স্থানান্তর করা হয়েছে, যেখানে তার বোন মারা গেছে।
বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ মহামারি
বাংলাদেশ বর্তমানে হামের এক ভয়াবহ মহামারির কবলে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ২৫০ জনের বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। দেশের হাসপাতালগুলোতে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল শিশুদের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়; অনেক শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগছিল এবং অনেকে নিথর হয়ে পড়ে ছিল। শয্যাসংকটের কারণে অনেককে মেঝেতেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাম এমন একটি রোগ, যা এক দশক আগে বিজ্ঞানীরা নির্মূল করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু এখন এটি অনেক দেশে নাটকীয়ভাবে ফিরে আসছে। কানাডা এবং বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সম্প্রতি তাদের ‘হাম-মুক্ত’ মর্যাদা হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০-এর বেশি হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে তা ছিল মাত্র ১০০-এর মতো। মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাজুড়েও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান টিকা-অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদানে বিঘ্ন এবং যুদ্ধ—এ সবকিছুই হাম ফিরে আসার কারণ।
টিকা সংকটের কারণ
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ উচ্চ টিকাদানের হার নিয়ে গর্ব করে এসেছে। কিন্তু ১৭ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষের এই দেশে এই মহামারির মূল কারণ হলো ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় এক বিপর্যয়কর অবনতি। এর ফলে দেশব্যাপী টিকার সংকট দেখা দেয় এবং টিকাদানের হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়। রোগটি ছড়িয়ে পড়ার পর শিশুদের উচ্চ অপুষ্টি এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা মৃত্যুর সংখ্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুঃখজনক ঘটনা প্রমাণ করে, জনস্বাস্থ্যের অগ্রগতি কত দ্রুত ধ্বংস হতে পারে।
বাংলাদেশ সাধারণত শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দুটি ডোজ দেয়। এ ছাড়া প্রতি চার বছর অন্তর দেশব্যাপী বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো হয়, যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে এবং ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা যায়। হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে এটা জরুরি। বছরের পর বছর ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করে আসছিল, যার বেশির ভাগ অর্থায়ন করত ‘গ্যাভি’। সরকারও এতে অবদান রাখত।
অভ্যুত্থানের প্রভাব
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এই ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। ব্যাপক বিক্ষোভের পর স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং অর্থনীতিবিদ ও নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূস সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দেয় এবং উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে চলে যায়।
ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘এটি ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। আমি বারবার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলাম। খোদার দোহাই লাগে...এমনটা করবেন না।’
রানা ফ্লাওয়ার্স এ কথা অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে বলেছিলেন বলে জানান। নূরজাহান বেগমের কাছে এ বিষয়ে সায়েন্স সাময়িকীর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
দরপত্র জটিলতা ও টিকার অভাব
দরপত্রপ্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায় এবং টিকার সরবরাহ ফুরিয়ে আসে। এতে দেশজুড়ে টিকার অভাব দেখা দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সাল থেকে পিছিয়ে ২০২৫ সালে নেওয়া সম্পূরক এমআর টিকাদান কর্মসূচিটিও বাতিল করা হয়। এই বছরের মার্চের শেষ দিকে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। (পরে এই তথ্য সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।)
জানুয়ারি মাসে মিয়ানমার সীমান্তের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে প্রথম হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। পরে দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এটি এখন বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়েছে। ২১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ২৩ এপ্রিল এক হালনাগাদ তথ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করেছিল, মিয়ানমার ও ভারতে হাম ছড়িয়ে পড়ার ‘ঝুঁকি’ রয়েছে। ডব্লিউএইচও এই প্রাদুর্ভাবকে ‘হাম নির্মূলে বাংলাদেশের আগের অগ্রগতির একটি পশ্চাদপসরণ’ বলে বর্ণনা করেছে।
অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা
বাংলাদেশে প্রকট অপুষ্টির সমস্যাটি এই রোগ এবং মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বকায় এবং ১০ শতাংশ কৃশকায়। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী এ এস এম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে তিনটি ভিটামিন-এ কর্মসূচি বাদ পড়েছে।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘টিকাদানের ঘাটতি ছাড়াও এই সংকট বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ করছে।’
নতুন সরকারের পদক্ষেপ
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়া নতুন নির্বাচিত সরকার এখন ব্যবস্থা নিচ্ছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, এপ্রিলে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু হয়েছে এবং ডব্লিউএইচও ও গ্যাভির সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান শুরু হয়েছে। ভিটামিন-এ কর্মসূচিও শিগগিরই শুরু হবে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগনিয়ন্ত্রণ পরিচালক বে-নজির আহমেদ সতর্ক করে বলেন, হাম যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে জরুরি ক্যাম্পেইন খুব দ্রুত এই মহামারি থামাতে পারবে না। মুশতাক হোসেন মনে করেন, সরকারের উচিত দ্রুত ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা।
দায় নিয়ে বিতর্ক
এই সংকট দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ পরিস্থিতির জন্য শেখ হাসিনা ও অন্তর্বর্তী সরকার—উভয়কেই দায়ী করেন।
সায়েন্স সাময়িকী যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাঁদের অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে আঙুল তুলেছেন। গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনায় ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রধান রানা ফ্লাওয়ার্সও মনে করেন, এই ভুল সিদ্ধান্তের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সায়েদুর রহমান অবশ্য দাবি করেন, আগের পদ্ধতিটি জরুরি অবস্থার জন্য তৈরি একটি আইনি ধারার ওপর ভিত্তি করে হয়েছিল। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাঁরা নিয়মিত নিয়মে আনতে চেয়েছিলেন। তিনি টিকার অভাব ও মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করে বলেন, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।



