শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন, পালিত হচ্ছে শব্দ সচেতনতা দিবস
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিছু এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণাও করা হয়েছে—তবু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। রাজধানী ঢাকার প্রায় সব এলাকাই এখন শব্দে সরব। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি এমন যে, শব্দে যেন কানেই পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। এই বাস্তবতার মধ্যেই আজ ২৯ এপ্রিল পালিত হচ্ছে শব্দ সচেতনতা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘প্রোটেক্ট ইয়োর ইয়ার, প্রোটেক্ট ইয়োর হেলথ’।

শব্দ সচেতনতা দিবসের ইতিহাস

শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর হিয়ারিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন (সিএইচসি) ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি বছর এপ্রিল মাসের চতুর্থ বুধবার আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস পালন করে আসছে। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে এপ্রিলের শেষ বুধবার দিবসটি পালিত হচ্ছে।

শব্দদূষণের প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণ এখন নগর জীবনের অন্যতম বড় সমস্যা। যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ, লাউডস্পিকারসহ নানা উৎস থেকে উচ্চমাত্রার শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ এবং মানসিক চাপের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারের উদ্যোগ ও বাস্তবতা

বাংলাদেশ সরকারও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ২০০৬ সালে প্রণয়ন করা হয় শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা। এর আওতায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালত এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে হর্ন বাজানো বা উচ্চ শব্দ সৃষ্টি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে বাস্তবতা বলছে, এসব নিয়ম অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। রাজধানীর সচিবালয়ের সামনে, বিমানবন্দর সড়কসহ বিভিন্ন ‘নীরব এলাকা’তে নিয়মিতই উচ্চ শব্দ শোনা যায়। হাসপাতাল ও স্কুলের সামনে অবাধে হর্ন বাজানো, নির্মাণকাজে শব্দ নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণার তথ্য

ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্টের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশের’ এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে ১২০ থেকে ১৩২ ডেসিবেলের মধ্যে ওঠানামা করে। এর প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে যানবাহনের হর্ন, ইটভাঙার মেশিন, জেনারেটর, কলকারখানা এবং বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। দিবসটি উপলক্ষে ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের এক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনেও এই তথ্য তুলে ধরা হয়।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি

বিশ্ব সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৩০টি গুরুতর রোগের পেছনে ১২ ধরনের পরিবেশ দূষণ ভূমিকা রাখে, যার মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। এর ফলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যথা, খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসসহ নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, শিশু, রোগী, ট্রাফিক পুলিশ, পথচারী ও চালকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ওয়াটার কিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়কারী শরীফ জামিল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবিদরা শব্দদূষণ নিয়ে কাজ করছেন। সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি সরকারকেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এর সুফল তেমনভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, শব্দদূষণ শুধু শ্রবণশক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এটি হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি বিরক্তি, অনিদ্রা ও মনোযোগহীনতার মতো মানসিক সমস্যাও তৈরি করে।

সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত—শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ—এই তিনটির সমন্বয়ই এখন সবচেয়ে জরুরি।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় সমাবেশের আয়োজন করেছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল ইসলাম।