হামে শিশুমৃত্যু: কোভিডের শিক্ষা আমরা নিইনি, বারবার একই ভুল
হামে শিশুমৃত্যু: কোভিডের শিক্ষা আমরা নিইনি

হামে শিশুমৃত্যু: কোভিডের শিক্ষা আমরা নিইনি, বারবার একই ভুল

হামে আক্রান্ত সাত মাস বয়সী আয়ানকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছেন বাবা মোহাম্মদ মনির। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এই দৃশ্য কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার কাছে এক নির্মম প্রশ্ন। হামে প্রতিটি শিশুমৃত্যুর খবর আমাদের কেবল শোকাহত করে না, লজ্জিতও করে। কারণ, হাম এমন একটি রোগ, যাকে মানবসমাজ বহু আগেই চিহ্নিত করেছে, যার বিস্তার, ঝুঁকি ও পরিণতি সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞান সুস্পষ্ট ধারণা রাখে। তারপরও যদি একটি দেশের শিশুরা হামে মারা যায়, তাহলে সেটি শুধু একটি রোগের আক্রমণ নয়; সেটি জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ঘাটতির স্পষ্ট লক্ষণ। এই মৃত্যু অনিবার্য ছিল না। সময়মতো টিকা, সঠিক নজরদারি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং কার্যকর জনসচেতনতা থাকলে এমন অনেক মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হতো।

কোভিড-১৯-এর শিক্ষা

এই জায়গাতেই কোভিড-১৯-এর শিক্ষা আবার সামনে এসে দাঁড়ায়। কোভিড আমাদের শিখিয়েছিল, স্বাস্থ্য কোনো একক খাত নয়; এটি রাষ্ট্রের সব খাতের ভিত্তি। জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়, সামাজিক স্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এই সত্যটি পৃথিবীর বহু দেশ দ্রুত উপলব্ধি করেছিল। তারা মহামারিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়েছিল। কোথাও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা হয়েছে, কোথাও রোগতত্ত্ব নজরদারি ও ল্যাব সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থা স্থায়ী করা হয়েছে, কোথাও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, তথ্যব্যবস্থা ও জরুরি প্রস্তুতির কাঠামো শক্তিশালী করা হয়েছে। তারা বুঝেছে, মহামারি শেষ মানেই ঝুঁকি শেষ নয়; বরং ভবিষ্যতের সংকট ঠেকাতে এখনই বিনিয়োগ করতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আমরা কোভিডের শিক্ষা নিইনি

কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, আমরা কোভিড থেকে এই মৌলিক শিক্ষা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করিনি। কোভিডের সময়ে জরুরি প্রয়োজনের চাপে কিছু পরিবর্তন হয়েছিল—আইসিইউ শয্যা বেড়েছিল, সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছিল, পরীক্ষা ও নজরদারির কিছু সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল, সংকট ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক সমন্বয়ের একটি তাগিদ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু মহামারি যখন দৃশ্যত কমে এল, তখন সেই অভিজ্ঞতাকে স্থায়ী সংস্কারে রূপান্তর করার যে রাষ্ট্রীয় দায় ছিল, আমরা তা পূরণ করতে পারিনি।

ফলে আজ হামে শিশুমৃত্যুর মতো ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে: আমরা এখনো প্রতিরোধমূলক রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারিনি; এখনো আমরা মূলত প্রতিক্রিয়াশীল। অর্থাৎ সংকট দেখা দিলে আমরা নড়েচড়ে বসি, কিন্তু সংকট আসার আগেই প্রস্তুতি নিই না। রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর সভা করি, মৃত্যুর পর বিবৃতি দিই, সংবাদে এলে তৎপর হই—কিন্তু ঝুঁকি আগে থেকে চিহ্নিত করা, মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বাড়ানো, তথ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জরুরি সাড়ার কাঠামো সক্রিয় রাখা—এসবকে নিয়মিত রাষ্ট্রীয় চর্চায় পরিণত করতে পারিনি।

হামের প্রেক্ষাপটে ব্যর্থতা

হামের প্রেক্ষাপটে এই ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট। কারণ, এটি আমাদের বলে দিচ্ছে, একটি রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু ওষুধ বা হাসপাতাল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য কাঠামো, যে কাঠামো সময়মতো সতর্ক হবে, ঝুঁকি বুঝবে, মাঠপর্যায়ে কাজ করবে, তথ্য বিশ্লেষণ করবে এবং মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছাবে। কোভিডের সময় এ কথাই তো বলা হয়েছিল—মহামারি শেষ হলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি শেষ হবে না। নতুন রূপে, নতুন জীবাণুতে, নতুন সংক্রমণ-চক্রে, কিংবা পুরোনো রোগের পুনরুত্থানে সংকট আবার আসবে। সে সতর্কবাণী আমরা শুনেছি, কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আত্মস্থ করিনি।

ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বায়ো-সিকিউরিটি

কোভিডের শিক্ষা ছিল পরিষ্কার: স্বাস্থ্য আগে, বাকি সব পরে। আর চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের স্পষ্ট করে দিচ্ছে—বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ দেখতে না চাইলে, শিশুর টিকা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। আর এ জন্য ভ্যাকসিন উৎপাদনসহ সামগ্রিক বায়ো-সিকিউরিটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

যেমন ২০২১ সালে প্রক্রিয়া শুরু হলেও ইডিসিএল-এর ভ্যাকসিন উৎপাদন প্রকল্প এখনো জমি অধিগ্রহণের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পাওয়ার পর গোপালগঞ্জে প্রথম দফায় জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালে গোপালগঞ্জের পরিবর্তে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে সরকারি খাসজমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, ভ্যাকসিনের মতো একটি উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য যে দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন, তা গড়ে তোলার উদ্যোগ এখনো শুরু হয়নি। দেরি হলেও এখনই একটি উপযুক্ত অর্গানোগ্রাম প্রণয়ন করে সে অনুযায়ী জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে তাদের দেশি-বিদেশি উপযুক্ত প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, বিশ্বের অভিজ্ঞ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করাও অত্যাবশ্যক। বরাবরের মতো শুধু অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর জনবলের পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের উদ্যোগ নিলে সেখানে কার্যকর ভ্যাকসিন উৎপাদন সম্ভব হবে না; বরং অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও একটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হবে। বিষয়টির প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

স্বাস্থ্য সংস্কারের অঙ্গীকার

এখন তাই হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার সংকেত—আমাদের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো নড়বড়ে, প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ, সমন্বয় দুর্বল, আর দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা অপর্যাপ্ত। কোনো দেশে যখন প্রতিরোধযোগ্য বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগে শিশু মারা যায়, তখন বোঝা যায় সেখানে শুধু চিকিৎসার ঘাটতি নয়, শাসনেরও ঘাটতি আছে। এই শোক আমাদের যে শিক্ষা দেয় তা হলো—ভ্যাকসিন উৎপাদনসহ সামগ্রিক বায়ো-সিকিউরিটি ব্যবস্থা তৈরি না করলে অদূর ভবিষ্যতে অন্য কোনো মহামারি, এন্ডেমিক রোগের তীব্রতা, বা আকস্মিক প্রাদুর্ভাবের মুখে আরও প্রাণহানির সম্মুখীন হতে হবে।

আমাদের একটি প্রবণতা হলো, স্বাস্থ্য সংকটকে সাময়িক ঘটনা মনে করা। আমরা ভাবি, একটি ঢেউ কেটে গেলে বিপদও কেটে গেছে। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে বিপদ বহুস্তরীয়—কখনো নতুন ভাইরাস, কখনো পুরোনো সংক্রমণের প্রত্যাবর্তন, কখনো জলবায়ুজনিত রোগ বিস্তার, কখনো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, কখনো নগর ঘনত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে বিস্তার। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শুধু রোগী সামলানোর জন্য নয়, ঝুঁকি পূর্বানুমান, দ্রুত সাড়া, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক আস্থা রক্ষার জন্যও প্রস্তুত রাখতে হয়।

রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গীকার

এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা শুধু বাজেট বরাদ্দে সীমাবদ্ধ নয়। জনস্বাস্থ্য একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। যদি বড় প্রকল্পের জৌলুশের ভিড়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদানসহ রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, রোগ নজরদারি, ল্যাব সক্ষমতা, জরুরি প্রস্তুতি, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী, সরবরাহব্যবস্থা ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া উপেক্ষিত হয়, তাহলে কোনো সংকটই আসলে ‘অপ্রত্যাশিত’ থাকে না; সেটি কেবল ‘অপ্রস্তুত অবস্থায় এসে পড়া’ সংকট হয়ে দাঁড়ায়।

হামের বর্তমান পরিস্থিতি সেই অপ্রস্তুতিরই প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের থামিয়ে দিয়ে বলছে: কেবল অতীতের শোক স্মরণ করলে হবে না, সেই শোককে প্রতিষ্ঠানগত শিক্ষায় রূপ দিতে হবে। কোভিড-পরবর্তী স্বাস্থ্য সংস্কার কাগজে নয়, বাস্তবে দরকার ছিল; এখনো দরকার। কারণ, প্রশ্নটি শুধু একটি রোগের নয়; প্রশ্নটি পুরো ব্যবস্থার। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ছি, যা আগাম সতর্কতা শুনে ব্যবস্থা নেয়? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যা প্রতিটি সংকটের পর দেরিতে উপলব্ধি করে যে আগেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল?

উপসংহার

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়; তার পরিচয় মেলে সবচেয়ে দুর্বল মানুষের নিরাপত্তায়। শিশুদের জীবন রক্ষা করতে না পারলে উন্নয়নের গল্প পূর্ণতা পায় না। আর যদি হামের মতো সতর্কবার্তাও আমাদের না জাগায়, তাহলে ভবিষ্যতের আরও বড় স্বাস্থ্য সংকটে আমাদের আরও বড় মূল্য দিতে হবে।

কোভিডের শিক্ষা ছিল পরিষ্কার: স্বাস্থ্য আগে, বাকি সব পরে। আর চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের স্পষ্ট করে দিচ্ছে—বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ দেখতে না চাইলে, শিশুর টিকা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। আর এ জন্য ভ্যাকসিন উৎপাদনসহ সামগ্রিক বায়ো-সিকিউরিটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

এখন প্রশ্ন, আমরা কি এসব শিক্ষা আমাদের নীতিতে, প্রতিষ্ঠানে ও কাজে রূপ দেব, নাকি ডু-নাথিং সংস্কৃতি লালন করে পরবর্তী মহামারির জন্য আবারও শোকের প্রস্তুতি নেব?

ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস, বাংলাদেশ।