সফলতার আড়ালে তানভীরের নিঃসঙ্গতার গল্প
সফলতার আড়ালে তানভীরের নিঃসঙ্গতা

রাজধানীর ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড়ের মাঝে থেকেও কেউ কেউ নীরবে হারিয়ে যান নিজের ভেতরে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে জমে ওঠে একাকিত্ব আর অজানা বেদনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর হোসাইন শুভর (৪৫) জীবন শেষ পর্যন্ত এমনই এক নিঃসঙ্গতার করুণ গল্প হয়ে রইল।

পরিবারের শেষ যোগাযোগ

ঈদের আগের দিন তিনি ছোট ভাইকে ফোন করেছিলেন। ঈদের দিনও বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল। স্বাভাবিক খোঁজখবর, সাধারণ আলাপচারিতা—সবকিছুই ছিল অন্য দিনের মতো। কিন্তু পরিবারের কেউ বুঝতে পারেননি, ওই কথোপকথনই হয়তো তাদের সঙ্গে তার শেষ কথা। কয়েকদিন পর রাজধানীর মুগদার একটি বাসার বন্ধ দরজার ওপাশে মিলল তার নিথর দেহ। ঘর থেকে বের হচ্ছিল তীব্র দুর্গন্ধ। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে সামনে আসে মর্মান্তিক দৃশ্য।

মরদেহ উদ্ধার

মঙ্গলবার (০২ জুন) রাতে মুগদার ওই বাসা থেকে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় তানভীর হোসাইন শুভর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যক্তিগত জীবনের নিঃসঙ্গতা

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তানভীর কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেও ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অনেকটাই নিঃসঙ্গ। ২০১২ সালে তার বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু সেই সংসার টিকেছিল মাত্র তিন মাস। ডিভোর্সের পর আর কখনো নতুন করে সংসার গড়েননি তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং পরিচিতজনদের সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দেন।

নিহতের বন্ধু আজাদ বলেন, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, তানভীর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘সবার সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। কোথাও গেলে কম কথা বলত। বিয়ের পর ডিভোর্স হওয়ার পর থেকেই সবার সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিল। কী কারণে সে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে, সেটা বলতে পারছি না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বন্ধুর এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আড়ালে সরিয়ে নেওয়া একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি। যিনি কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন নিয়মিত, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনকে ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিলেন নিজের ছোট্ট পরিসরে।

পরিবারের বক্তব্য

নিহতের ছোট ভাই শৈবাল জানান, তিন ভাইয়ের মধ্যে তানভীর ছিলেন মেজো। বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। মুগদার বাসাটিতে একাই থাকতেন। তিনি বলেন, ‘২০১২ সালে তার বিয়ে হয়। বিয়ের তিন মাস পরই ডিভোর্স হয়ে যায়। এরপর আর বিয়ে করেনি। ঈদের আগের দিন আমি সিলেটে ছিলাম। নরমালি আমাকে ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছে। তখন মনে হয়নি সে কোনো চিন্তায় আছে বা কোনো ডিপ্রেশনে ভুগছে। বেশি সময় কথা বলেনি, তবে স্বাভাবিক ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘মুগদার বাসায় সে একাই থাকত। ঈদে বাড়িতে যেত না। ঢাকাতেই একা একা ঈদ করত। কী কারণে এমন করল, আমরা কিছুই বলতে পারছি না।’

স্বজনদের কথায় বারবার ফিরে আসে একটি বিষয়—তানভীরের জীবন ছিল অনেকটাই নির্জন। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন ছিল না, কিন্তু একসঙ্গে বসবাসও করতেন না। নিজের মতো করে একা থাকতেন, একা সময় কাটাতেন, এমনকি উৎসবের দিনগুলোও কাটত একাকী।

নিহতের বাবা তবারক হোসেনও ছেলের মৃত্যুতে বিস্মিত ও শোকাহত। তিনি জানান, ঈদের আগের দিন এবং ঈদের দিন ছেলের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে তার কথা কম হতো। তবে ঈদের আগের দিনও কথা হয়েছে, ঈদের দিনও কথা হয়েছে। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। আমরা সেগুনবাগিচায় থাকি। সে মুগদায় একা বাসা নিয়ে থাকত। কীভাবে কী হলো, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

একজন বাবার এই অসহায় প্রশ্ন পুরো ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি তুলে ধরে। যে সন্তানের সঙ্গে কয়েকদিন আগেও কথা হয়েছে, তার মৃত্যুর খবর এভাবে জানতে হবে—এমন বাস্তবতা মেনে নেওয়া পরিবারের জন্য সহজ নয়।

পুলিশের তদন্ত

পুলিশ জানায়, ঈদের দিন শেষবারের মতো তানভীর হোসাইন শুভকে দেখেছিলেন বাড়ির মালিক। এরপর কয়েকদিন তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাসার দরজা বন্ধ ছিল। ভেতর থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। মঙ্গলবার (২ জুন) ঘর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে বাড়ির লোকজন বিষয়টি পুলিশকে জানায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের সবুজবাগ জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জাহিদ হাসান বলেন, ‘প্রতিবেশীদের ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে একটি কক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর হোসেইন শুভর মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।’

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর পর কয়েকদিন ধরে মরদেহটি ঘরের ভেতরেই ছিল। সে কারণেই উদ্ধারকালে মরদেহে ব্যাপক পচন দেখা যায়।

সুরতহাল প্রতিবেদন

সুরতহাল প্রতিবেদনে মুগদা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বোরহান উদ্দিন ভূঁইয়া মরদেহের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, মরদেহে পচন ধরেছিল এবং দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ার স্পষ্ট আলামত ছিল। গলায় একটি লাল-হলুদ গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া যায়।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এসআই বোরহান উদ্দিন ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, মানসিক অবসাদ ও দীর্ঘদিনের বিষণ্নতার কারণে তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।

এসআই বোরহান উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কেন এবং কী কারণে তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন, সে বিষয়টি জানার চেষ্টা চলছে।

পেশাগত সাফল্যের আড়ালে

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে তানভীর হোসাইন শুভ দায়িত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। কর্মজীবনের পরিচয় ছিল প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানজনক। কিন্তু তার মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে স্বজনদের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরেকটি বাস্তবতা—একজন মানুষ পেশাগত সাফল্যের শিখরে পৌঁছালেও ব্যক্তিগত জীবনের নীরবতা, একাকিত্ব কিংবা মানসিক ভার কতটা গভীর হতে পারে, তা অনেক সময় বাইরের মানুষ বুঝতে পারেন না।

ঈদের দিনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা মানুষটির জীবন কয়েকদিনের মধ্যেই থেমে গেছে এক বন্ধ ঘরের ভেতর। দরজার ওপাশে জমে ছিল নীরবতা, আর সেই নীরবতার মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে এক মানুষের দীর্ঘ পথচলা।

তার মৃত্যু এখন স্বজনদের কাছে শুধু শোকের নয়, অসংখ্য উত্তরহীন প্রশ্নেরও নাম। কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, কী ছিল তার ভেতরের অজানা কষ্ট—সেসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো খুঁজে ফিরবে পরিবার, আর তার উত্তর জানার চেষ্টা চালিয়ে যাবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।