গ্রামে ফ্রিজের ব্যবহার বাড়লেও মাংস সংরক্ষণে সচেতনতার অভাব
গ্রামে ফ্রিজের ব্যবহার বাড়লেও মাংস সংরক্ষণে সচেতনতা নেই

সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ, আর তার হাত ধরে গ্রামীণ গৃহস্থালির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ। বিশেষ করে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদে গ্রাম অঞ্চলেও ফ্রিজ কেনার ধুম পড়ে। তবে ফ্রিজ ব্যবহারের হার বাড়লেও, কোরবানির মাংস সঠিক নিয়মে সংরক্ষণের বিষয়ে গ্রামীণ মানুষের সচেতনতা কতটুকু-তা নিয়ে রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন।

মাংস সংরক্ষণে ভুল ধারণা ও অভ্যাস

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাংস ধুয়ে পানি ঝরানো, ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ করা কিংবা ফ্রিজের সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখার মতো অতি জরুরি নিয়মগুলো এখনও অনেকেরই অজানা। সাতক্ষীরা সদর, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার কয়েকটি এলাকার গৃহিণীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোরবানির মাংস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সিংহভাগ মানুষই সনাতন পদ্ধতি ও নিজস্ব ধারণা খাটান।

সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর গ্রামের গৃহিণী রাবেয়া খাতুন বলেন, "কোরবানির মাংস পাওয়ার পর তাড়াহুড়ো করে ধুয়েই ফ্রিজে রেখে দেই। পানি ঝরানোর অত সময় কই? আর বড় বড় পলিথিনে একবারে অনেক মাংস ঠাঁইলাই (গাদাগাদি করে) রেখে দিই, পরে রান্নার সময় বের করে কুড়ল (দা) দিয়ে কুপিয়ে ছাড়াতে হয়।" অনেক পরিবারে আবার মাংস না ধুয়েই রক্তসহ ফ্রিজে রেখে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। খামারি ও সাধারণ গ্রামবাসীদের একাংশের ধারণা, ফ্রিজে রাখলে সব জীবাণু এমনিতেই মরে যায়, তাই বাড়তি নিয়মের প্রয়োজন নেই।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফ্রিজ বিক্রি বাড়লেও সচেতনতা নেই

সাতক্ষীরা শহরের ওয়াল্টন শোরুম ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, "এখন আর ফ্রিজ শুধু শহরের মানুষের বিলাসী পণ্য নয়। গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে প্রবাসী পরিবার বা খামারিরা এখন নগদ টাকা বা কিস্তিতে দেদারসে ফ্রিজ কিনছেন। ঈদের আগে ডিপ ফ্রিজ এবং বড় ধারণক্ষমতার ফ্রিজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে কাস্টমাররা ফ্রিজের স্থায়িত্ব বা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয় জানতে চাইলেও, মাংস কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রাখতে হবে সে বিষয়ে কোনও পরামর্শ জানতে চান না।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সঠিক পদ্ধতি

সঠিক নিয়মে মাংস সংরক্ষণ না করলে পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা। সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসক ডা. জয়ন্ত কুমার বলেন, "মাংস ফ্রিজে রাখার আগে অবশ্যই ভালো করে রক্ত ধুয়ে, সম্পূর্ণ পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। ভেজা মাংস রাখলে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। সবচেয়ে বড় ভুল হয় বড় বড় প্যাকেটে মাংস রাখা। মাংস রাখতে হবে ছোট ছোট প্যাকেটে, যেন একবার ফ্রিজ থেকে বের করলে পুরোটা রান্না করা যায়। বারবার বরফ গলানো এবং পুনরায় ফ্রিজিং করা মাংসের পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয় এবং পেটের পীড়াসহ ফুড পয়জনিংয়ের কারণ হতে পারে।"

তিনি আরও জানান, "কোরবানির ঈদের সময় ফ্রিজে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মাংস গাদাগাদি করে রাখা হয়। এতে ফ্রিজের ভেতরের বাতাস চলাচল ব্যাহত হয় এবং মাংসের ভেতরের অংশ কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রায় বা তার নিচে পৌঁছায় না। ফলে বাইরে থেকে ভালো মনে হলেও ভেতরে মাংস পচতে শুরু করে।"

তিনি আরও বলেন, "স্থানীয় গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যকর্মী এবং মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে যদি কোরবানির আগে মাংস সংরক্ষণের সঠিক নিয়মগুলো প্রচার করা যায়, তবেই ফ্রিজের আসল সুফল পাবে গ্রামীণ মানুষ।"