‘রাতে দুবার কথা হছে। বেটির (মেয়ে) জন্য খেলনা কিনিছে। সেই খবর শুনি বেটি কত খুশি। বাপে খেলনা নিয়া আনছে। এখন হামার ছাওয়ালেক কী জবাব দিমো। হামার ছাওয়াল কাক বাপ বলে ডাকবে? হামার কী হবে?’ বিলাপ করতে করতে এভাবে কাঁদছিলেন সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারানো নওগাঁর মান্দা উপজেলার বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নওগাঁর মান্দা উপজেলার একটি গ্রামের সাত জনসহ মোট ১০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের একজন বাদশা মিয়া। এ ঘটনায় এলাকায় নেমেছে শোকের ছায়া। কেউ বাবা, কেউ স্বামী, কেউ সন্তান কিংবা ভাই হারিয়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
দুর্ঘটনার বিবরণ
সোমবার (২৫ মে) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কের সরাতৈল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ১৫ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ১০ জনই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভাঁরশো ইউনিয়নের বাসিন্দা। এর মধ্যে একই গ্রামের সাত জন রয়েছেন।
নিহতদের পরিচয়
তারা হলেন- ভাঁরশো ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তারেক জিয়া (২১), বাদশা মিয়া (৩০), আবদুল বারিক (২০), সোহাগ হোসেন (২১), রবিউল ইসলাম (২৮), মাইনুর ইসলাম (৩০) ও সাগর হোসেন (২০)। এ ছাড়া পাকুড়িয়া গ্রামের সহোদর মাইনুর রহমান (২৫) ও গিয়াস উদ্দিন (২২) এবং মশিদপুর গ্রামের সুজন আলী (৩৫)।
দুপুরে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের বাড়িতে মানুষের ভিড়। একই গ্রামের সাত জনের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ এলাকাবাসী। স্বজনরা করছেন আহাজারি। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই কারও।
ফেরিওয়ালাদের করুণ পরিণতি
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাইকেলে করে দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্লাস্টিকের পণ্যের বিনিময়ে চুল, ভাঙা মোবাইলসহ বিভিন্ন জিনিস কিনতেন ভাঁরশো ইউনিয়নের ১০ ব্যক্তি। সর্বশেষ তারা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার উত্তর নাজিরপুর এলাকায় ফেরি করে পণ্য কেনাবেচার কাজ করছিলেন। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রডবোঝাই ওই ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু বাড়ি ফেরা হলো না তাদের। পথে ট্রাক উল্টে ওই ১০ ফেরিওয়ালাসহ ১৫ জন নিহত হন।
এক পরিবারের করুণ কাহিনী
নিহত মাইনুর ইসলামের চাচাতো ভাই রবিউল ইসলাম জানান, ভাইয়ের সঙ্গে রবিবার বিকালে ফোনে তার কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, সোমবার রাতে ঈদ করতে ওরা বাড়িতে ফিরবেন। মাইনুর ভাইয়ের অসুস্থ মা-বাবা আছে। তিন বছর বয়সী এক ছেলেসন্তান ও স্ত্রী আছে। পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। এখন তার মৃত্যুতে পুরো পরিবারটা অচল হয়ে গেলো।
পুলিশের সহায়তা
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে মান্দা উপজেলার ১৩ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। আরও কেউ আছেন কিনা, তার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। টাঙ্গাইল থেকে মরদেহ আনার বিষয়ে স্বজনদের সহযোগিতা করছে পুলিশ।’



