কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের নুর মিয়ার ছেলে আবুল খায়ের (৪৩) দীর্ঘ ২২ বছর ধরে শিকলবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর থেকে তিনি কোনো চিকিৎসা পাননি। পরিবারের সদস্যরা সবাই মারা যাওয়ায় বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
পারিবারিক পটভূমি ও অসুস্থতা
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া আবুল খায়ের পেশায় ছিলেন মাটিকাটা শ্রমিক। ২০০১ সালে তিনি বিয়ে করেন। তখন তার আয়ে তিন সদস্যের সংসার চলত। তবে বিয়ের তিন বছরের মাথায় তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং মানসিক ভারসাম্য হারান। এ সময় তার আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হলে একপর্যায়ে ২০০৪ সালে তাকে শিকলবন্দি করা হয়।
পরিবারের করুণ পরিণতি
পরবর্তীতে তার বাবা নুর মিয়া ২০০৭ সালে মারা যান। এরপর তাকে দেখাশোনার দায়িত্ব নেন তার জেঠা আবদুর রহিম ও চাচাতো ভাই সিএনজি অটোরিকশা চালক আবদুর রহমান। তিন বছর আগে আবদুর রহিমও মারা গেলে বর্তমানে আবুল খায়েরকে দেখাশোনা করছেন আবদুর রহমান ও তার বৃদ্ধা মা মনোয়ারা বেগম।
শারীরিক অবস্থা ও পরিচর্যা
স্থানীয়রা জানান, টিনশেড ঘরের একটি ছোট অংশে কোমরে শিকলবন্দি অবস্থায় দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জীবন কাটাচ্ছেন আবুল খায়ের। দীর্ঘদিন শিকলে বাঁধা থাকার কারণে তিনি এখন স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতেও পারেন না। অনেক সময় কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন, মাটিতে গড়াগড়ি করেন। তাকে পরিচর্যা করতে গিয়ে বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগমও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
আবদুর রহমান বলেন, “তিনি আমার চাচাতো ভাই। পরিবারের কেউ নেই। আমরা যতটা পারি দেখাশোনা করছি। দীর্ঘদিন শিকলে বাঁধা থাকার কারণে তিনি স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার অভাবে আমরা তাকে সুস্থ করতে পারছি না।” তিনি আরও জানান, পাঁচ বছর আগে স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে পাবনার একটি মানসিক হাসপাতালে নেওয়া হলেও নানা জটিলতার কারণে ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। তিনি আরও বলেন, “ভালো চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। এজন্য আমরা সবার সহযোগিতা চাই।”
প্রশাসনের উদ্যোগ
এ বিষয়ে মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ বি এম সারোয়ার রাব্বী বলেন, বিষয়টি জানার পর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বরুণ চন্দ্র দে জানান, তিনি বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল ইসলাম পাটোয়ারি বলেন, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রথমে চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের রোগীদের জন্য কমিটি রয়েছে। চিকিৎসার পর প্রয়োজন হলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।



