হামের প্রকোপ: হাসপাতালে রোগীর চাপ কমছে না, মৃত্যু ৪৫১
হামের প্রকোপ: হাসপাতালে রোগীর চাপ কমছে না, মৃত্যু ৪৫১

দুটি হাসপাতাল ঘুরে শয্যা না পেয়ে মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে আনা হয় হামের উপসর্গ থাকা সাত মাস বয়সী ময়মুনাকে। সন্তানের কথা বলতেই কাঁদছেন লক্ষ্মীপুর থেকে আসা এই মা।

হাসপাতালে রোগীর চাপ

সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি থাকতে দেখা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ উদ্যোগ নিলেই হাসপাতালে রোগীর চাপ কমানো সম্ভব।

গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪০ হাজার ১৭৬ জন রোগী ভর্তি হয়। এই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে ৩৬ হাজার ৫৫ জন ছাড়পত্র পায়। অর্থাৎ গতকাল সারা দেশে ৪ হাজার ১২১ জন হামের রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল। হাসপাতালে ভর্তি ছাড়াও হামের রোগী আছে, যারা বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে না আসায় হাসপাতালে রোগী আসছে, ভর্তিও হচ্ছে। অনেক হাসপাতালে হামের মতো সংক্রামক রোগের জন্য নির্ধারিত শয্যার চেয়ে রোগী বেশি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অনেক হাসপাতালের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে।

তথ্য প্রকাশে ঘাটতি

কোন হাসপাতালে কত রোগী আছে, কত শয্যা খালি, আইসিইউ খালি আছে কি না—এসব তথ্য সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র প্রকাশ করে না। অথচ কোভিড-১৯ মহামারির সময় এসব তথ্য দেওয়া হতো, যা রোগী ব্যবস্থাপনার জন্য দরকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) পরিচালক আবু আহমেদ আল মামুন বলেন, ‘সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের হামের রোগীর তথ্য আমরা নিয়মিত প্রকাশ করছি। প্রতিটি জেলার সিভিল সার্জন ও সিটি করপোরেশনগুলোর স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছ থেকে আমরা রোগীর তথ্য পাই। তবে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য পৃথকভাবে নেই।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কমছে না। ১ মে সারা দেশের হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল ৩ হাজার ৪৫০ জন। সাত দিন পর ৭ মে ভর্তি রোগী ছিল ৩ হাজার ৬৭৪ জন। আরও সাত দিন পর অর্থাৎ গতকাল শুক্রবার রোগী ছিল ৪ হাজার ১২১ জন।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের অবস্থা

মার্চ মাসের মাঝামাঝি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর যেসব হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি ছিল, সেগুলোর একটি রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ১৪ মে পর্যন্ত এই হাসপাতালে ৬৪৮টি শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ মে ৮৫টি শিশু ভর্তি ছিল। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক বলেন, ‘রোগীর চাপ সামান্য কমেছে। তবে আইসিইউতে রোগীর চাপ কমেনি।’

টিকা কার্যক্রম ও ঝুঁকি

সরকার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় হামের টিকা দেওয়া শুরু করে ৫ এপ্রিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, এসব উপজেলায় হামের সংক্রমণ কমে এসেছে। অনেকে মনে করেন, দেশব্যাপী হামের টিকার ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার এক-দেড় মাসের মধ্যে সারা দেশে সংক্রমণ কমে আসবে। তবে সামনের কোরবানির ঈদের ছুটিতে এই সংক্রমণ আবার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

রাজধানীর সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান বলেন, ‘এখন মাঝেমধ্যে ঝড়বৃষ্টি হওয়ার কারণে কিছু শিশু সর্দি-জ্বরে পড়ছে। কোরবানির ঈদের ছুটির সময় বাচ্চারা অবাধভাবে হইচই করবে, একে অন্যের সংস্পর্শে আসবে, এতে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।’ এই হাসপাতালে হামের রোগীর জন্য শয্যা বরাদ্দ ১০টি। গতকাল রোগী ছিল ৫৪ জন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার টিকা দেওয়া ছাড়া হামের রোগী কমাতে আর কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এর জন্য সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে হবে, স্পষ্ট করে করণীয় সম্পর্কে বলতে হবে। তাঁরা মনে করছেন, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় যে মাত্রায় প্রচার চালানো দরকার, তা হচ্ছে না। পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালেরও কিছু করণীয় আছে।

বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘সব রোগী হাসপাতালে নেওয়ার বা যাওয়ার দরকার নেই। রোগীদের বাড়িতে আইসোলেশনের ব্যাপারে উৎসাহিত করতে হবে। মানুষকে নিয়মিত সাবানপানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে হবে। সব রোগীর রোগ শনাক্তের জন্য পরীক্ষার দরকার নেই, ক্লিনিক্যালি রোগনির্ণয়ই যথেষ্ট।’

হাসপাতালগুলোতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন মাহমুদুর রহমান। এগুলো হচ্ছে: ১. কোন শিশুর জ্বর ও কোন শিশুর শরীরে র‍্যাশ আছে তা দেখে হাসপাতালে ভর্তির আগেই আলাদা করতে হবে, প্রতিটি হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক কর্নার করতে হবে, রোগীদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে; ২. প্রাকৃতিকভাবে হাওয়া-বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে; ৩. সেবার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে সার্জিক্যাল মাস্ক দিতে হবে; ৪. সাবানপানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে, নিয়মিত হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নের ব্যবস্থা রাখতে হবে; ৫. হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় দর্শনার্থীর ভিড় কমাতে হবে, একটি শিশুর কাছে একজনের বেশি সেবাদানকারী রাখা যাবে না।

মৃত্যুর সংখ্যা

হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা) দেশে আরও ১২ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে চার শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল আট শিশুর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হাম শনাক্ত হয়ে মারা যাওয়া চার শিশুর দুটি ঢাকা বিভাগের আর একটি করে রয়েছে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া আট শিশুর তিনটি ঢাকা বিভাগের, তিনটি চট্টগ্রাম বিভাগের আর একটি করে রয়েছে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে।

এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৩৭৭ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৭৪ শিশু। মোট ৪৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।