বাংলাদেশে প্রাণী নির্যাতনের ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি নরসিংদীতে একটি কুকুরকে গলায় দড়ি বেঁধে ইট ঝুলিয়ে নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হলেও তিনি জামিন পেয়েছেন।
প্রাণী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র
গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে হইচই হওয়ার পর কিছু ঘটনা আইনের আওতায় এলেও বেশিরভাগই চাপা পড়ে যায়। কুকুর, বিড়াল, বানর, হাতি, বনবিড়াল, মেছোবাঘ, পাখি— কেউই বাদ যাচ্ছে না। মানুষ কেন প্রাণী হত্যা করছে, তার নির্দিষ্ট কারণ নেই; মনে হচ্ছে, হত্যা করার আনন্দেই হত্যা করছে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, যারা প্রাণীকে অনুভূতিহীন বস্তু হিসেবে দেখে বা তাদের কষ্টকে গুরুত্ব দেয় না, তাদের মধ্যে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের ঝুঁকি বেশি হয়। সহানুভূতির অভাব এ ধরনের ঝুঁকির একটি বড় কারণ।
পথকুকুর হত্যার পেছনে ভুল ধারণা
কিছুদিন ধরে একটি গ্রুপ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে যে পথকুকুর জলাতঙ্ক ছড়ায়, কাজেই তাদের হত্যা করে এর সমাধান করতে হবে। প্রাণী রক্ষাকারী গ্রুপ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, নির্বিচারে কুকুর হত্যা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়, বরং টিকাদান ও নিউটারকরণ বেশি কার্যকর।
মানুষ যখন দেখে কোনও প্রাণীকে নির্যাতন ও হত্যা করে কেউ শাস্তি পাচ্ছে না, তখন সে সেই আচরণ আরও বেশি করতে উৎসাহিত বোধ করে। বাংলাদেশে প্রাণিকল্যাণ আইন থাকলেও অপরাধ জামিনযোগ্য, মামলা কম হয় এবং শাস্তিও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অপরাধীদের মধ্যে ভয়ের অনুভূতি তেমন থাকে না।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও আইনি পদক্ষেপ
২০২৪ সালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জাপান গার্ডেন সিটিতে ১০টি কুকুর ও একটি বিড়াল বিষাক্ত খাবার খেয়ে মারা যায়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং মামলা হয়। পরবর্তীকালে তদন্তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদন দেওয়া হলেও মামলাটি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকে।
২০২১ সালে ২০টি কুকুর হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালে তিনজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এটি বাংলাদেশে প্রাণিকল্যাণ আইনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দণ্ডাদেশ।
শিশুদের প্রাণীপ্রেমী করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
গবেষণা বলছে, শৈশব থেকে প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা শেখানো হলে শিশুর মনে মানুষের প্রতি সহানুভূতিও বাড়ে। যে শিশু পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বড় হবে, সেই শিশু মানুষের প্রতিও ভালোবাসা দেখাবে। আর যে শিশু পশুপাখিকে নির্যাতন করছে, তাকে নিয়ে আশঙ্কা আছে বলে গবেষণা বলছে।
কারাগারে থাকা সহিংস অপরাধীদের ওপর করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সহিংস অপরাধীরা অহিংস অপরাধীদের তুলনায় শৈশবে বেশি প্রাণী নির্যাতন করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রাণী নির্যাতনকে ভবিষ্যতের খুনির 'প্রমাণ' হিসেবে নয়, বরং প্রাথমিক সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত, যেন সময়মতো মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক সহায়তা দেওয়া যায়।
সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ
রাষ্ট্রের দ্রুত প্রতিক্রিয়া সমাজে বার্তা দেয় যে প্রাণীর ওপর সহিংসতাও অপরাধ। নরসিংদীতে কুকুর হত্যার ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বলেছেন, প্রাণী হত্যা বন্ধ করতে হবে। বগুড়ায় পথকুকুরকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আটক করা হয়েছে।
প্রাণী নির্যাতন বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট।



