পিরোজপুরে পুলিশ মেসের কেয়ারটেকারের উপর নৃশংস নির্যাতন: ডিবি পুলিশের তিন সদস্য প্রত্যাহার
পিরোজপুরে পুলিশ কর্মকর্তাদের মেসের কেয়ারটেকার মো. ইউনুস ফকিরকে চুরির মিথ্যা অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যদের নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় জেলার ডিবি পুলিশের তিন সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই তিন সদস্য হলেন ওসি আরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন ও মো. কায়সার। তাদের বিরুদ্ধে ইউনুস ফকিরের পুরুষাঙ্গে মোমবাতি গলিয়ে নির্যাতন করার ভয়াবহ অভিযোগও উঠেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও তদন্ত প্রক্রিয়া
ঘটনাটি গত ১৩ এপ্রিল সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে সংঘটিত হয়। ওসি আরিফুল ইসলাম দাবি করেন যে তার কক্ষ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে এবং ইউনুস ফকিরই সেই টাকা নিয়েছেন। টাকা চুরির কথা অস্বীকার করায় ইউনুসকে হাতকড়া পরিয়ে ভবনের নিচতলায় নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। পরবর্তীতে ডিবি পুলিশের আরও ৭–৮ জন সদস্য সেখানে গিয়ে তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়।
ইউনুস ফকির জানান, তার দুই পায়ের পাতার নিচে পিটিয়ে রক্তাক্ত ও ফোলা জখম করা হয়। চিৎকার করলে তার মুখে লাঠি দিয়ে শব্দ বন্ধ করে রাখা হয়। একপর্যায়ে ডিবি পুলিশ সদস্য কায়সারের নেতৃত্বে ৩–৪ জন জোর করে তাকে রান্নাঘরে নিয়ে যায় এবং সেখানে তার পুরুষাঙ্গে আগুনে মোমবাতি গলিয়ে তপ্ত মোম ফেলে নির্যাতন চালায়।
এ ঘটনা জানাজানির পর পিরোজপুর জেলা পুলিশ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। পিরোজপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মজনুর আহম্মেদ সিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানান, তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখে একটি প্রতিবেদন দেবে এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বর্তমানে ছুটিতে আছেন এবং ছুটি থেকে ফিরে বিস্তারিত মন্তব্য করবেন বলে জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও পরিবারের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার তিন দিন পর শুক্রবার দুপুরে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে নিজ উদ্যোগে ভর্তি হয়েছেন ইউনুস ফকির। চিকিৎসাধীন ইউনুসের ওপর যে দৈহিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা অত্যন্ত নৃশংস ও অমানবিক বলে মন্তব্য করেছেন পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নিজাম উদ্দিন।
ইউনুস ফকিরের ভাই আনিসুর রহমান বলেন, "একজন খুনিকেও এভাবে নির্যাতন করা হয় না, যেভাবে আমার ভাইকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে।" তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন এবং ইউনুসের ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে, তার বিচার চান।
টাকা উদ্ধার ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া
পরবর্তীতে পুলিশ মেসের পরিচ্ছন্নতা কর্মী শাকিল খানের কাছ থেকে চুরি যাওয়া সমুদয় টাকা উদ্ধার হয়। ইউনুস ফকিরকে পিরোজপুরের পুলিশ সুপারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে, পুলিশ সুপার ইউনুসের কাছ থেকে বিস্তারিত শোনার পর শাকিল খানকে ডেকে পাঠান। জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল টাকা চুরির কথা স্বীকার করে এবং পুলিশ সেই টাকা উদ্ধার করে। পরে ইউনুসের দেওয়া টাকা আরিফুল ইসলাম ফেরত দেন বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল আউয়াল জানান, ঘটনাটি পুলিশের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে সার্বিক ঘটনার বিচার করা হবে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় থানা পুলিশের বিকল্প হিসেবে ডিবি পুলিশের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
ইউনুস ফকির ২০১৮ সাল থেকে পিরোজপুর শহরতলীর ঝাটকাঠি এলাকায় অবস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের মেসের চারতলা ভবনের কেয়ারটেকারের দায়িত্বে রয়েছেন। এই ঘটনা পুলিশ বাহিনীর ভেতরে নৃশংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা এখন তদন্তের অধীনে রয়েছে।



