দিনাজপুর মেডিকেলে রোগীর মৃত্যুতে উত্তেজনা, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে সেবা ব্যাহত
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীতে সাড়ে ৫ ঘণ্টার কর্মবিরতির দিকে নিয়ে যায়। এই কর্মবিরতির ফলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ সব ধরনের চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে যায়, যাতে সাধারণ রোগীরা মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হন।
ঘটনার সূত্রপাত ও কর্মবিরতির বিবরণ
সোমবার ভোররাত সাড়ে ৪টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ইন্টার্ন চিকিৎসকরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান গেটে তালা লাগিয়ে কর্মবিরতি পালন করেন। তারা সব ধরনের চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখেন, যা স্থানীয় রোগীদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে দিনাজপুর শহরের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ (৬৫) বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় সিসিইউ-২ ইউনিটে ভর্তি হন। রাত দেড়টার দিকে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
মৃত্যুর খবর পেয়ে রোগীর স্বজনরা হাসপাতালে ভিড় জমায় এবং ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে। এক পর্যায়ে উত্তেজনা বাড়লে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি সংঘটিত হয়। ঘটনার সংবাদ পেয়ে কোতয়ালি থানা পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রাত সাড়ে ৩টার দিকে রোগীর স্বজনরা আব্দুস সামাদের মরদেহ নিয়ে বাড়িতে ফিরে যায়।
পুলিশি ব্যবস্থা ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবি
পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় শহরের পাটুয়াপাড়া এলাকার বখতিয়ার খিলজির ছেলে নাহিদুর রহমানকে (৪০) আটক করা হয়েছে। দিনাজপুর কোতয়ালি থানার ওসি নূর নবী বলেন, ঘটনার পর একজনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যসহ একটি টিম হাসপাতালে অবস্থান করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখেছে।
এই ঘটনার জের ধরে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা হাসপাতালে নিজেদের নিরাপত্তা ও ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন। তারা ভোর সাড়ে ৪টা থেকে জরুরি বিভাগের প্রধান গেটে তালা দিয়ে প্রতিবাদ জানান। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে সকাল ১০টার দিকে গেটের তালা ভাঙা হয় এবং চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফজলুর রহমান ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম থেকেই রোগীর অবস্থা ভালো ছিল না। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর রোগীর স্বজনরা আমাদের চিকিৎসককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। অন্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অশালীন আচরণ করেন। পরে পুলিশকে অবহিত করা হলে একজনকে আটক করে। হার্ট অ্যাটাকের রোগী ঝুঁকিতেই থাকে। প্রতিটি মৃত্যুই দুঃখজনক। তারপরও আমরা সর্বাধিক চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুদিন ধরেই দেখছি, কোনও রোগী মারা গেলেই চিকিৎসকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ধর্মঘট শুরু করেন। হাসপাতালকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য আমরা সবার সহযোগিতা কামনা করছি।’
এই ঘটনা চিকিৎসা সেক্টরে নিরাপত্তা সংকট ও চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের টানাপোড়েনের দিকে আলোকপাত করেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের তৎপরতা সত্ত্বেও, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলেছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।



