হামে শিশুর মৃত্যু: ময়মনসিংহে মায়ের কান্নায় ভারী আইসোলেশন ওয়ার্ড
হামে শিশুর মৃত্যু: ময়মনসিংহে মায়ের কান্না

হামে শিশুর মৃত্যু: ময়মনসিংহে মায়ের কান্নায় ভারী আইসোলেশন ওয়ার্ড

তিন বছরের ছেলেকে মৃত ঘোষণার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন মা আরিফা আক্তার। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে এই মর্মান্তিক দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে থাকে উপস্থিত অভিভাবক ও চিকিৎসকরা। শিশু রোগীতে ঠাসা ওয়ার্ডে হঠাৎ এক মায়ের করুণ আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ, অন্যরা তখন বলতে শুরু করেন, "এই যে আরেক মায়ের বুক খালি হলো।"

মায়ের করুণ আহাজারি ও সান্ত্বনার চেষ্টা

কান্নার আওয়াজ আসা কেবিনটির সামনে গিয়ে দেখা যায়, একজন নারী চিকিৎসক শিশুটির মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আবদুল্লাহ নামের শিশুটি মারা গেছে—চিকিৎসক এমনটি জানানোর পর আহাজারি করা মা আরিফা আক্তার বলতে থাকেন, "আমার বুকের ধনরে ফিরায়া দেও আল্লাহ। আমার ছেলে কী আর হাসত না। জ্বর নিয়া হাসপাতালে ভর্তি হইছিলাম, মেডামরা কইছে ওষুধ খাইলেই ভালা হয়া যাইব। আল্লাহগো তুমি কী করলা।"

সন্তান হারানো আরিফা আক্তারের কান্না ছুঁয়ে যায় আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা অন্য শিশুর স্বজনদের। আতঙ্কিত হয়ে কোনো কোনো মা-বাবা তাঁর শিশুকে কোলে তুলে পায়চারি করতে থাকেন। কেউ আবার এগিয়ে আসেন আরিফাকে সান্ত্বনা দিতে, কিন্তু মায়ের বেদনা যেন অশ্রুতে ডুবে যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিশুর চিকিৎসা ইতিহাস ও হাসপাতালের পরিসংখ্যান

হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২ এপ্রিল ভর্তি করা হয়েছিল ময়মনসিংহ নগরের জামতলা মোড় এলাকার মো. রনি ও আরিফা আক্তার দম্পতির তিন বছর বয়সী ছেলে আবদুল্লাহকে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটি আরও কিছু শারীরিক জটিলতায় ভুগছিল। এক মেয়ের পর ছেলেসন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন বুনেছিল এই দম্পতি, কিন্তু হামের নির্মম থাবায় তা ভেঙে পড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হামের লক্ষণ নিয়ে নতুন করে ২৬টি শিশু ভর্তি হয়েছে। ৬৪ শয্যার ওয়ার্ডে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭৬ শিশু, যেখানে প্রতি শয্যায় দুজন শিশু ধরা হয়।

গত ১৭ মার্চ থেকে আজ সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয় মোট ৩২৪টি শিশু। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ২৩৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৯টি শিশুর। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে আরও ২৬ শিশু, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নতুন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন মৃত্যু ও মোট হিসাব

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন দুই শিশুর মৃত্যু হয়, যা হামের প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহতা তুলে ধরে। মৃত্যুবরণ করা দুই শিশু হলো নেত্রকোনা সদরের ইলিয়াস হোসেনের তিন মাস বয়সী মেয়ে আদিবা ও ত্রিশাল উপজেলার মো. রাসেল মিয়ার আট মাস বয়সী ছেলে আরাফাত।

  • গত ১৭ মার্চ হামের লক্ষণ নিয়ে তিন মাস বয়সী আদিবাকে ভর্তি করা হয়েছিল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকাল আটটার দিকে তার মৃত্যু হয়।
  • আট মাস বয়সী আরাফাতকে গত ১৮ মার্চ ভর্তি করা হলে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে মারা যায়।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় আরও এক শিশু আবদুল্লাহর মৃত্যুর হিসাব ধরলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ জনে। এই পরিসংখ্যান হামের বিরুদ্ধে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে, বিশেষ করে শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য বিভাগের তৎপরতা সত্ত্বেও, ময়মনসিংহ অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, এবং চিকিৎসা সুবিধার চাপ বাড়ছে ক্রমাগত। এই পরিস্থিতিতে শিশুদের টিকাদান ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি উঠছে সর্বস্তরে।