চট্টগ্রামে হাসপাতাল নির্মাণ স্থগিত: চিকিৎসা সেবায় ঘাটতি ও সংকটের দীর্ঘ ইতিহাস
চট্টগ্রামে হাসপাতাল নির্মাণ স্থগিত, চিকিৎসা সেবায় সংকট

চট্টগ্রামে চিকিৎসা সেবায় ঘাটতি: হাসপাতাল নির্মাণ স্থগিত ও সংকটের দীর্ঘ ইতিহাস

চট্টগ্রামে যখনই কোনো রোগের মহামারি দেখা দেয়, তখন চিকিৎসা সেবার নানা ঘাটতি আলোচনায় আসে। হামের মতো রোগ নির্ণয়ের জন্য অনেক পরীক্ষা ঢাকা থেকে করতে হচ্ছে, যা স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। এই পরিস্থিতিতে, চট্টগ্রামে চিকিৎসা সেবা উন্নয়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কর্ণফুলী উপজেলা ও হাটহাজারী উপজেলায় ৫০০ ও ২৫০ শয্যার দুটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

হাসপাতাল নির্মাণ স্থগিত: স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তার বক্তব্য

স্বাস্থ্য বিভাগের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, এই দুটি হাসপাতালের নির্মাণ প্রক্রিয়া এখন সম্পূর্ণভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। অথচ, এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও উত্তর চট্টগ্রাম, বিশেষ করে রাঙ্গামাটি এলাকার বাসিন্দারা ব্যাপকভাবে উপকৃত হতেন। এর মধ্যে, নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় নতুন একটি হাসপাতাল নির্মাণের আলোচনা চলছে, কিন্তু তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত: সমন্বয়হীনতা ও সুবিধার অভাব

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছেন, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সুবিধা বিবেচনা করে উপযুক্ত স্থানে হাসপাতাল নির্মাণ করলে মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। তবে, বর্তমানে হাসপাতাল নির্মাণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। করোনা ভাইরাস, আগুনে পোড়া, ডেঙ্গু ও হামের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে চট্টগ্রামে চিকিৎসা সেবায় নানা সংকট প্রকটভাবে প্রকাশ পায়। তখন চিকিৎসা সেবা নিয়ে হয়রানি ও দুর্ভোগে পড়ে আক্রান্ত রোগীরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি

চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য খাতের ঘাটতি অনেক পুরোনো একটি সমস্যা। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল নিয়োগ নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে একের পর এক চিঠি দিলেও কোনো অগ্রগতি হয় না। যখন কোনো রোগ মহামারিতে রূপ নেয়, তখন কিছু করার থাকে না। চমেক হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, ফৌজদারহাট সংক্রামণ ব্যাধি হাসপাতাল ও উপজেলা সদর হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও টেকনিক্যাল জনবলসহ নানা সমস্যা বিদ্যমান।

  • চিকিৎসা উপকরণ থাকলে পরিচালনায় পর্যাপ্ত জনবল থাকে না।
  • চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে এক যুগ আগে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও চিকিৎসক, নার্স ও জনবলের পদ সৃজন করা হয়নি।
  • মাঝে মধ্যে মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিরা পরিদর্শনে এসে নানা পরিকল্পনার কথা বলে গেলেও অগ্রগতি হয় না।

চিকিৎসা সরঞ্জামের অব্যবস্থাপনা ও রোগীদের দুর্ভোগ

হাসপাতালের বিদ্যমান চিকিৎসা উপকরণের অধিকাংশই নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার জন্য চিকিৎসাধীন রোগীরা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ছুটছেন, যা তাদের জন্য বাড়তি আর্থিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করছে। চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিয়ে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে আগুনে পোড়া রোগীরা। চমেক হাসপাতালে ২৬ বেডের যে বার্ন ওয়ার্ড রয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নেই। আইসিইউ নেই, অপারেশন ব্যবস্থা নেই, দক্ষ জনবল নেই।

এতে ২০ শতাংশের বেশি আগুনে পোড়া রোগীদের নিয়ে ছুটতে হচ্ছে ঢাকায় বার্ন ইনস্টিটিউটে। সম্প্রতি হালিশহরে গ্যাস বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৯ জন দগ্ধ হয়ে সাত জনই মারা গেছে। তাদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়েছে, যা এই সংকটের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ ও বর্তমান অবস্থা

গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় ৫০০ শয্যার ও কর্ণফুলী উপজেলার ক্রসিং এলাকায় ২৫০ শয্যার দুটি হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। হাসপাতালের জন্য জমিও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এই দুটি হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া এখন স্থগিত হয়ে গেছে। এই স্থগিতাদেশ চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার জোর দিচ্ছেন যে, সমন্বিত পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামে চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব। অন্যথায়, রোগ মহামারির সময়ে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে থাকবে।