৮৭ বছরের সিস্টার রোজ: মানবতার মা যিনি বাংলাদেশের নাগরিক হতে চান
সিস্টার রোজ: মানবতার মা, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চান

মানুষের মূল্যায়ন: সম্পদ নাকি নিঃস্বার্থ সেবা?

একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য কী দিয়ে মাপা উচিত? অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা, নাকি মানুষের জন্য করা নিঃস্বার্থ কাজ? মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার প্রত্যন্ত বল্লভপুর গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁদের মতে, এই প্রশ্নের সর্বোত্তম উত্তর হল জিলিয়ান মার্গারেট রোজ নামের ৮৭ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নার্স। স্থানীয়রা যাঁকে 'সিস্টার রোজ' বা 'মানবতার মা' বলে ডাকে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবনের অধিকাংশ সময় বাংলাদেশে কাটিয়ে হাজারো মানুষের সেবা করে যাওয়া এই মহিয়সী নারীর এখন একটিই শেষ ইচ্ছা—তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হতে চান।

৬০ বছরের নিঃস্বার্থ সেবার ইতিহাস

১৯৬৪ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে আসেন সিস্টার রোজ। তারপর থেকে দীর্ঘ ছয় দশক ধরে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নার্স হিসেবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর খুলনা অঞ্চলে উদ্বাস্তু ও দুস্থ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে তিনি মেহেরপুরের বল্লভপুরে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে সেখানে একটি ব্যাপক মানবিক সেবাকেন্দ্র গড়ে তোলেন।

বল্লভপুরের সমন্বিত সেবা প্রতিষ্ঠান

বল্লভপুর হাসপাতালে বর্তমানে ৩০ শয্যার চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। সেখানে এমবিবিএস ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য কর্মীরা নিয়মিত কাজ করছেন। মূলত প্রসূতি মা ও শিশুদের সেবাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালটি পরিচালিত হলেও জরুরি চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হয়। বহির্বিভাগে রোগীদের বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। নবজাতকদের জন্য ইনকিউবেটরসহ একটি আধুনিক বেবিকেয়ার ইউনিটও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। হাসপাতালের পাশেই গড়ে উঠেছে একটি বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অসহায় ও বয়স্করা নিরাপদ আশ্রয় পান। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য নার্সিং প্রশিক্ষণ এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে এই কেন্দ্রে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যক্তিগত ত্যাগ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

এই সকল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে রয়েছে সিস্টার রোজের নিজের পেনশনের সঞ্চিত অর্থ এবং বিদেশি পরিচিতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সহায়তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি নিজে এই সেবা কার্যক্রম থেকে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না। প্রতিদিন ভোরে উঠে ওয়ার্ড পরিদর্শন করা থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত রোগী দেখা তাঁর নিয়মিত দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। দেশে যেখানে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা এখনো নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে, সেখানে সিস্টার রোজের মতো মানুষের অবদান বিশেষভাবে মূল্যবান। ধর্ম, জাতি বা সামাজিক শ্রেণি-নির্বিশেষে সবাই তাঁর কাছে সমানভাবে সেবা পান।

সিস্টার রোজের এই অসামান্য অবদান আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেছে। মানবসেবায় অনন্য ভূমিকার জন্য যুক্তরাজ্য সরকার তাঁকে অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার সম্মাননায় ভূষিত করেছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এমন একজন নিঃস্বার্থ মানবসেবক কি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য নন?

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব: একটি নৈতিক দাবি

বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক বিদেশি নাগরিক তাদের মানবিক ও সামাজিক অবদানের জন্য বিশেষ সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। সিস্টার রোজের ক্ষেত্রেও এই মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত। বিদ্যমান আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করা হলে তা শুধু একজন মানবসেবকের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনই হবে না, বরং সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের প্রতিও রাষ্ট্রের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করবে। বল্লভপুরের মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনে দেওয়া এই মহান নারীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করা এখন সময়ের দাবি।