চট্টগ্রামে বার্ন ইউনিট সংকট: জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হিসেবে পরিচিত, যেখানে শিল্পাঞ্চল, বন্দর, গ্যাস স্থাপনা, গুদাম এবং ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার বিস্তার রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি এখানে তুলনামূলকভাবে বেশি। এমন একটি অঞ্চলে আগুনে পোড়া ও দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য একমাত্র ভরসা যদি হয় মাত্র ৬০ শয্যার একটি বার্ন ইউনিট, যা নিজস্ব নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউ ছাড়া পরিচালিত হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসকদের প্রতিনিয়ত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হওয়া
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের নিয়মিত সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হতে হয়। আইসিইউ সুবিধার অভাবে, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের সীমিত শয্যার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে একসঙ্গে একাধিক দগ্ধ রোগী আসলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব করে তোলে। এমন অবস্থায় রোগীদের ঢাকায় অবস্থিত জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকে না। পুড়ে যাওয়া রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সড়কপথে ঢাকায় নেওয়া মানে তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলা।
পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক চিত্র
২০২৫ সালে এই ইউনিটে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৪৪২ রোগীর মধ্যে ১২৩ জনের মৃত্যু এবং গুরুতর অবস্থায় ৫৮ জনকে ঢাকায় পাঠানোর তথ্য পরিস্থিতির দুঃখজনক গভীরতাই তুলে ধরে। সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোর অগ্নিকাণ্ড, সীমা অক্সিজেন কারখানার বিস্ফোরণ কিংবা সাম্প্রতিক হালিশহরের বিস্ফোরণের মতো ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে, বড় দুর্ঘটনা ঘটলে চট্টগ্রামের নিজস্ব চিকিৎসা সক্ষমতা দ্রুত ফুরিয়ে যায়। অথচ এই নগরীটি দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত, যেখানে ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র বার্ন ইনস্টিটিউট বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত ছিল।
নতুন প্রকল্পের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে ১৫০ শয্যার একটি নতুন বার্ন ইউনিট নির্মাণাধীন রয়েছে, যেখানে ১০ শয্যার আইসিইউ, ২৫ শয্যার এইচডিইউ, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার এবং জরুরি বিভাগের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, প্রকল্পের অগ্রগতি এখনো মাত্র ২৬ শতাংশে রয়েছে। জায়গা দখল, উচ্ছেদ এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ইতিমধ্যে প্রচুর সময় নষ্ট হয়েছে, এবং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও করা হয়েছে। এই ধীরগতি জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোর গুরুত্ব
জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখা যাবে না; এটি জীবন রক্ষার একটি পূর্বশর্ত। চট্টগ্রামের মতো শিল্পনগরীতে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নত করার কাজটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের প্রস্তুতি নেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সময়ে বিদ্যমান ইউনিটে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি দগ্ধ রোগীর পেছনে একটি পরিবার এবং একটি জীবনের স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে, তাই চিকিৎসার অভাবে বা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় তাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
চট্টগ্রামের মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ বার্ন সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব নিশ্চিত করতে এখন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রকল্পের বিলম্বিত অগ্রগতি এবং বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো দুর্ঘটনায় আরও বেশি জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়।
