গ্রিন কোজি কটেজ অগ্নিকাণ্ডের দুই বছর: তদন্ত এখনও শেষ হয়নি, ৪৬ প্রাণহানি
গ্রিন কোজি কটেজ অগ্নিকাণ্ডের দুই বছর, তদন্ত অসমাপ্ত

গ্রিন কোজি কটেজ অগ্নিকাণ্ডের দুই বছর: তদন্ত এখনও অসমাপ্ত, ৪৬ প্রাণহানির শোক

রাজধানীর বেইলি রোডে অবস্থিত গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুঃখজনক ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ রবিবার, ১ মার্চ। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে এই সাততলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যাতে ৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। তাদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী এবং আট জন শিশু অন্তর্ভুক্ত। এ ঘটনায় ৭৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।

তদন্ত প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা ও বিলম্ব

রমনা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের দায়ের করা মামলাটির তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। থানা-পুলিশের হাত ঘুরে সিআইডি পুলিশ তদন্ত করছে, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও, এখন পর্যন্ত ১৭ বার প্রতিবেদন দাখিলে সময় নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল, কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী তা জমা দিতে পারেননি। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা পরবর্তী দিন ১৯ এপ্রিল ধার্য রেখেছেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই জিন্নাত আলী জানিয়েছেন।

আসামিদের তালিকা ও আইনজীবীদের বক্তব্য

মামলাটিতে ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়, কিন্তু তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতায় সব আসামি বর্তমানে জামিনে আছেন। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁ মালিক সোহেল সিরাজ, জেইন উদ্দিন জিসান, ফুকো চেইন রেস্টুরেন্টের আব্দুল্লাহ আল মতিন, মোহর আলী পলাশ, চুমুকের মালিক আনোয়ারুল হক ও শফিকুর রহমান রিমন, স্পেস মালিক ইকবাল হোসেন কাউসার, এবং ভবন দেখভালের দায়িত্বে থাকা মুন্সী হাসিবুল আলম বিপুল, নজরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন ও ফরহাদ।

কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁ মালিক সোহেল সিরাজের আইনজীবী তাসলিমা মিনু দাবি করেন যে তাদের কোনও দায়িত্ব নেই, কারণ আগুন নিচতলা থেকে লাগে এবং তাদের তিন স্টাফ উদ্ধার কাজে মারা যায়। তিনি সঠিক তদন্তের দাবি জানান। অন্যদিকে, আসামি মুন্সি হামিমুল ইসলাম বিপুলের আইনজীবী মো. আনিসুজ্জামান নিরপরাধদের অব্যাহতি ও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার আহ্বান জানান।

তদন্তে বিলম্বের কারণ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

তদন্ত কর্মকর্তা শাহজালাল মুন্সী ব্যাখ্যা করেন যে যথা সময়ে বিভিন্ন ইউনিট থেকে তথ্য না পাওয়া এবং রাজউক ও আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের কাছ থেকে প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্তে বিলম্ব হচ্ছে। তিনি বলেন, "চেষ্টা করছি, মামলাটা দ্রুত সময়ে শেষ করার জন্য। আমরা তথ্য-উপাত্ত কিছু পেয়েছি। আর অল্প কিছু বাকি আছে। হয়তো শর্ট টাইমে পেয়ে যাবো।" তিনি আশ্বাস দেন যে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শীঘ্রই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ও নিরাপত্তা ঘাটতি

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ভবনের নিচ তলার চুমুক রেস্টুরেন্টে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে, যা থেকে আগুন ও প্রচণ্ড ধোঁয়া সৃষ্টি হয়। এই আগুন ও ধোঁয়া দ্রুত পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে বিভিন্ন ফ্লোরে অবস্থানকারী নারী, পুরুষ, শিশু ও ক্রেতারা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ও পুড়ে মারা যান। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ দ্রুত উদ্ধারকার্য চালালেও, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে ভবনটির স্বত্বাধিকারী ও ম্যানেজার যথাযথ অনুমোদন ছাড়া রেস্টুরেন্ট ভাড়া দিয়েছিলেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছিল।

এই ঘটনা শহুরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি ও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের অবহেলার চিত্র তুলে ধরে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ ট্র্যাজেডি রোধে জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।