ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসে নতুন ৫০০ শয্যার ভবন, শয্যাসংখ্যা ১০০০-এ উন্নীত
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে নতুন ৫০০ শয্যার ভবন যুক্ত

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে যুক্ত হলো নতুন ৫০০ শয্যার ভবন

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ৫০০ শয্যার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে যুক্ত করা হয়েছে আরও ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি নতুন ভবন। এই নতুন ভবনটি চালু হলে হাসপাতালটির মোট শয্যাসংখ্যা ১০০০-এ উন্নীত হবে, যা দেশের নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসা খাতে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হাসপাতালের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডাক্তারসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া চূড়ান্ত হলে দ্রুত নতুন ভবনে কার্যক্রম চালু করা হবে।

নতুন ভবনের স্থাপত্য ও সুবিধা

সরেজমিনে পরিদর্শন করে জানা গেছে, নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের নতুন ৫০০ শয্যার ভবনটি ১৫ তলাবিশিষ্ট, যার মধ্যে ভূগর্ভে তিন তলা এবং মাটির উপরে ১২ তলা রয়েছে। পুরাতন ১০ তলা ভবনের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত এই নতুন ভবনটি সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। উভয় ভবনের মধ্যে সহজে যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা রোগী ও চিকিৎসকদের জন্য সুবিধাজনক হবে।

নতুন ভবনে মাথায় ও মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের জন্য অপারেশনসহ সুচিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে ৪টি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ২টি জার্মানির যন্ত্রপাতি ও ইঞ্জিনিয়ারদের সহায়তায় স্থাপিত হয়েছে এবং বাকি ২টি দেশীয় ব্যবস্থাপনায় তৈরি। অপারেশন থিয়েটারে দেয়ালের সঙ্গে বিশেষ যন্ত্র বসানো হয়েছে, যা হাঁচি-কাশি বা অন্য কোনো কারণে জীবাণু প্রবেশ করলেও মুহূর্তে টেনে নিয়ে ধ্বংস করে দেবে, ফলে রোগী ও ডাক্তাররা শতভাগ নিরাপদে থাকবেন।

অত্যাধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি

নতুন ভবনে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক এমআরআই ও সিটিস্ক্যান মেশিন, যার প্রতিটির মূল্য কমপক্ষে ২৮ কোটি টাকা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ২/১টি বড় হাসপাতাল ছাড়া এই ধরনের যন্ত্রপাতি দেশে আর কোথাও নেই। এই মেশিনগুলোর মাধ্যমে বড়দের পরীক্ষায় সময় লাগে মাত্র এক মিনিট, আর শিশুদের কয়েক সেকেন্ডে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়ে যায়। এছাড়া নতুন ভবনে রয়েছে ১০০ বেডের পোস্ট অপারেটিভ আইসিইউ, যা গুরুতর রোগীদের জন্য অতিরিক্ত সেবা নিশ্চিত করবে।

রোগীদের চাপ ও চাহিদা

সারাদেশ থেকে প্রতিদিন ঘটনা-দুর্ঘটনায় আহতরা চিকিৎসার জন্য নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে আসেন। চিকিৎসকদের মতে, প্রতিদিন যত রোগী আসে, তার মধ্যে প্রতি পাঁচ মিনিটে একজন স্ট্রোকের রোগী থাকে। হাসপাতালটি মস্তিষ্কজনিত রোগের চিকিৎসায় আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্ণাঙ্গ এক হাজার বেডের হাসপাতাল চালু হলে চিকিৎসা পেতে রোগীদের ভোগান্তি অনেক কমে যাবে এবং শয্যা পেতে দীর্ঘদিনের অপেক্ষাও হ্রাস পাবে।

হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. বদরুল আলম বলেন, "বিনামূল্যে কিংবা সামান্য মূল্যে অত্যাধুনিক এমন চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা বিশ্বে খুব কমই আছে। হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছে, চাহিদার তুলনায় জনবল কম। মানুষ এখানে ফ্রি চিকিৎসা পাচ্ছেন। তবে হাসপাতাল কিংবা বেড বাড়িয়ে কোন লাভ হবে না, যদি ঢাকার বাইরে নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসা নিশ্চিত না করা হয়।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৫০০ শয্যার ভবনটি চালুর অপেক্ষায় রয়েছে এবং ডাক্তারসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগ হলেই এটি চালু করা সম্ভব হবে।

রোগীদের প্রতিক্রিয়া

গত বুধবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও বহির্বিভাগে আগত রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে এখন ভালো আছেন। চিকিৎসাধীন রোগীদের অভিভাবকদের কেউ কেউ বলেন, "তাদের (রোগী) সুস্থ জীবনে ফিরে পাবো আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। অপারেশনের পর সাতদিনের মধ্যে অনেকের সুস্থ হওয়া দেখে আমরা খুশি।" তবে অধিকাংশ রোগীর অভিযোগ, এখানে শয্যা পেতে সময় লাগে, যা নতুন ভবন চালু হলে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

হাসপাতালের ইতিহাস

প্রসঙ্গত, নব্বই দশকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দেশের স্বনামধন্য নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ ও ডা. বদরুল আলমের নেতৃত্বে প্রথম নিউরোলজি ইউনিট চালু করা হয়। ১৯৯৯ সালে মাত্র ২২টি শয্যা এই ইউনিটের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে ২০১২ সালে তৎকালীন সরকার ৫০০ শয্যার পৃথক নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল চালু করে, যা এখন নতুন ভবনের মাধ্যমে আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে।