কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ২০ শয্যা হাসপাতাল: কাগজে সচল, বাস্তবে পরিত্যক্ত
কেরানীগঞ্জের কোন্ডা হাসপাতাল: কাগজে সচল, বাস্তবে পরিত্যক্ত

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ২০ শয্যা হাসপাতালটি কাগজে কলমে সচল থাকলেও বাস্তবে প্রায় দুই দশক ধরে পরিত্যক্ত। সরকারি নথিতে সেখানে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও কর্মচারী নিয়োগপ্রাপ্ত আছেন এবং বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ আসে। কিন্তু স্থানীয়দের কাছে এটি এখন 'ভূতুড়ে হাসপাতাল' নামেই পরিচিত।

হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসপাতালটির মূল ফটক থেকে শুরু করে দরজা-জানালা, সিঁড়ির রেলিং সবই চুরি হয়ে গেছে বহু আগেই। পুরুষ ও নারী ওয়ার্ড থাকলেও নেই কোনো বেড। চারপাশ জুড়ে ঝোপঝাড়, ভাঙাচোরা দেওয়াল, আর মাদকসেবীদের আড্ডাস্থল। চারটি ভবনের মধ্যে তিনটি চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য নির্মিত হলেও সেখানে এখন কেউ বসবাস করে না।

কর্তৃপক্ষের দাবি বনাম বাস্তবতা

কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোকাদ্দেস দাবি করেছেন, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালটির বহির্বিভাগে স্বাস্থ্যসেবা চালু ছিল। তবে এলাকাবাসীর ভাষ্য, বহু বছর ধরে তারা সেখানে কাউকে চিকিৎসাসেবা নিতে বা দিতে দেখেননি। স্থানীয়দের মতে, এই দাবি অসত্য।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিয়োগ ও বরাদ্দ

ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কাগজে কলমে হাসপাতালটিতে চার জন চিকিৎসক নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে একজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সার্জারি কনসালট্যান্ট হিসেবে সংযুক্ত, একজন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, আর দুই জন কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন অফিস সহায়ক নিয়োগপ্রাপ্ত। গত অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে বেতন-ভাতা ছাড়াও বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ ছিল, কিন্তু হাসপাতালের কার্যক্রম সক্রিয় না থাকায় বেশির ভাগ অর্থ খরচ হয়নি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেতন-ভাতা ছাড়া অন্যান্য খাতে বরাদ্দ নেই, শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতে ১ লাখ টাকা রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চিকিৎসকের বক্তব্য

২০২৪ সালে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকে বদলি হয়ে কোন্ডা হাসপাতালে যোগদান করেন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অর্থোপেডিক্স) ডা. মামুনুর রশিদ। তিনি বলেন, 'আমি অর্থোপেডিক্স চিকিৎসক। কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে কী কারণে আমাকে কোন্ডা হাসপাতালে বদলি করা হলো তা জানি না। এখানে অর্থোপেডিক্স চিকিৎসকের প্রয়োজন নেই। বদলি হওয়ার পর থেকেই আমি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা দিচ্ছি এবং নিয়মিত বেতন পাচ্ছি না।'

ইতিহাস ও পুনরায় চালুর প্রচেষ্টা

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী আমান উল্লাহ আমানের উদ্যোগে হাসপাতালটি নির্মিত হয়। শুরুতে ১০ শয্যা হাসপাতাল হিসেবে চালু হলেও পরে ২০ শয্যায় উন্নীত হয়। উদ্বোধনের পর প্রথম দুই বছর সীমিত আকারে চিকিৎসাসেবা চালু ছিল, কিন্তু ২০০৮ সালের পর ধীরে ধীরে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম হাসপাতালটি পরিদর্শন করে পুনরায় চালুর আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

স্থানীয়দের দুর্ভোগ

কোন্ডা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, বহু বছর ধরে হাসপাতালটিতে কোনো চিকিৎসাসেবা নেই। জরুরি চিকিৎসা পেতে তাদের কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটতে হয়। হাসপাতালটিতে একসময় দায়িত্ব পালন করা উপসহকারী মেডিক্যাল কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, 'হাসপাতালটি শুরু থেকেই নিরাপত্তাহীন ছিল। কয়েক বার চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ফলে কেউ সেখানে থাকতে চাইতেন না। আগে আমরা সীমিত কিছু ওষুধ এনে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।'

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান বলেন, 'সারাদেশে ২০ শয্যা হাসপাতাল আছে ২৪টি, যার মধ্যে কেরানীগঞ্জেই তিনটি। আমার জানামতে কোন্ডা হাসপাতালটি ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা চালু নেই। সর্বশেষ গত বছর এপ্রিল ও মে মাসে হাসপাতালটির ইনস্পেকশন হয়েছিল।' তিনি আরও জানান, 'হাসপাতালটি সংস্কার ও পুনরায় চিকিৎসাসেবা চালুর ব্যাপারে গত বছর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেখানে প্রকল্প প্রস্তাব পাশ হয়নি।'