চাঁদপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চোর-মাদকসেবীদের দখল, জনবল-ওষুধ শূন্যতা
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গুপ্টি পশ্চিম ইউনিয়নের লাউতলী গ্রামটি একসময় আদর্শ গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই আদর্শ এখন উধাও হয়ে গেছে। মাদক ও অপরাধীরা এখানে ঘাঁটি গেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ইউনিয়নের একমাত্র স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। প্রায় ২৫ হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য পূর্ব লাউতলী গ্রামে গড়ে ওঠা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি এখন শুধু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা
এই কেন্দ্রে কোনো জনবল নেই, ওষুধের অভাব তীব্র, এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন। ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যেখানে চুরি হয়ে গেছে আসবাবপত্র ও বৈদ্যুতিক পাখা। রাত নামলেই এটি মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত প্রায় তিন বছর ধরে এই অবস্থা চলছে, যা এলাকার দরিদ্র মানুষদের জন্য মারাত্মক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসাসেবার সংকট ও প্রভাব
ওষুধ ও জনবল সংকটের কারণে এই কেন্দ্রে নরমাল ডেলিভারি, প্রসূতি সেবা, কিশোর-কিশোরী স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলস্বরূপ, গর্ভবতী মা ও শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে ১০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা সদর বা পার্শ্ববর্তী উপজেলার হাসপাতালে ছুটছেন, যা ভাঙাচুরা সড়ক পেরিয়ে যাত্রা করতে হয়।
স্থানীয়দের বক্তব্য
১০৫ বছরের বশির উল্যা মিজি বলেন, "আমাদের ত্যাগের মধ্য দিয়ে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, কিন্তু এখন ডাক্তার-ওষুধ কিছুই নেই। প্রাথমিক সেবা না পেয়ে মানুষ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।" সেবাপ্রার্থী আমিন উল্যাহ, সিরাজুল ইসলাম ও ফিরোজা বেগমের মতো বয়স্করা তাদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। আজগর আলী নামের এক বৃদ্ধ মর্মস্পর্শী মন্তব্য করেন, "আমরা গ্রামগঞ্জের মানুষ হওয়াই যেন পাপ হয়ে গেছে। এই কেন্দ্র এখন চুরি ও মাদকের আখড়া, হাসপাতাল নিজেই অসুস্থ।"
কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মো. মেহেদী হাসান উল্লেখ করেন যে, জনবল ও ওষুধ সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বুলবুল আহমেদ বলেন, "মাদকসেবী ও চোরচক্র অনেক কিছু লুট করেছে, চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষ ও মা-শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। দ্রুত কেন্দ্র সচল করা প্রয়োজন।" উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল জানান, তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করবেন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহযোগিতা বিবেচনা করা হবে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে লাউতলী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পুনরুজ্জীবন জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে স্থানীয়রা মৌলিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।



