অব্যবহৃত হাসপাতাল চালুতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, বরিশালে কাজ অসম্পূর্ণ
অব্যবহৃত হাসপাতাল চালুতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, বরিশালে কাজ অসম্পূর্ণ

দেশের ছয় জেলায় বিপুল ব্যয়ের পরও বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকা ছয়টি হাসপাতাল চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১০ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে হাসপাতালগুলো চালুর নির্দেশ দেন। আগামী আগস্ট মাসে এসব হাসপাতাল উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। তবে এর মধ্যে বরিশালের শিশু হাসপাতালের অধিকাংশ কাজ এখনও শেষ হয়নি।

বরিশাল শিশু হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বরিশাল নগরের আমানতগঞ্জ এলাকায় বিশেষায়িত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালের ভবন এখনও স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেনি গণপূর্ত বিভাগ। ভবনের লিফট, পানি ও বিদ্যুতের সাবস্টেশনসহ বহু কাজ এখনও বাকি পড়ে আছে। এমনকি ২০০ শয্যার মধ্যে রয়েছে মাত্র ৬৫টি, যা বিভিন্ন কক্ষে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। কর্মকর্তারা চান যেকোনো সময় উদ্বোধন সম্ভব বলে মনে হোক, কিন্তু বাস্তবে এসব শয্যার কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এসব কারণে হাসপাতালের সব কাজ সম্পন্ন করে আগামী আগস্টে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ।

পরিদর্শন ও তাগিদ

প্রধানমন্ত্রী হাসপাতাল চালু করার নির্দেশ দেওয়ার পর এরই মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনারসহ অনেকেই হাসপাতাল পরিদর্শন করে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার তাগিদ দিয়েছেন। বরিশাল গণপূর্ত বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতাল নির্মাণকাজে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৯ কোটি ৪৮ লাখ ৩৩ হাজার ৫১ টাকা। ১০ তলা ভিত্তির ওপর প্রাথমিকভাবে চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। কার্যাদেশ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম চালু হওয়ার কথা থাকলেও কাজ শেষ না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় ছয় বছর পরও চালু করা যায়নি। বিভাগের ছয় জেলা এবং পদ্মার এপারে ১১ জেলার শিশুদের কথা বিবেচনা করে এটির নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অসম্পূর্ণ কাজ

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১০ তলার ভিত্তির ওপর চারতলা ভবন নির্মিত হয়েছে। ভবনের বাউন্ডারি দেয়াল দিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক কাজ বাকি থাকায় আজ পর্যন্ত ভবন হস্তান্তর করতে পারেনি গণপূর্ত বিভাগ। কিন্তু ইতিমধ্যে অধিকাংশ টাকা তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

কী কী কাজ এখনও বাকি

ইতিমধ্যে হাসপাতালটি ঘুরে দেখেছেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীরসহ একদল প্রতিনিধি। হাসপাতালের একজন শিশু চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভবনের সার্বিক কাজ শেষ করে হস্তান্তরের পরও অনেক কাজ করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউ প্রস্তুত করতে হবে। জরুরি বিভাগ এমনভাবে করতে হবে যেখানে অন্তত ১০ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া যায়। তাহলে ভর্তি রোগীর চাপ অনেক কমে আসবে। নবজাতক শিশুদের জন্য ভিন্ন একটি ওয়ার্ড তৈরি করতে হবে। এরপর রয়েছে জনবল, সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস হচ্ছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া। এসব কাজ করতে অনেক সময় লাগবে।

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে আমি যেটুকু জানতে পেরেছি, দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক এনে এখানকার শিশু হাসপাতাল চালু করার কথা ভাবছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এভাবে ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হলে শিশু হাসপাতাল পরিচালনা করা কষ্টকর হয়ে পড়বে। এখানে ২০০ শয্যার হাসপাতাল বলা হলেও প্রতিদিন কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ শতাধিক শিশু চিকিৎসা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই প্রস্তুতি থাকতে হবে। ২০০ শয্যার রোগীর জন্য কমপক্ষে ডাক্তার, নার্স, আয়া, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীসহ পাঁচ শতাধিক জনবলের প্রয়োজন হবে। এখন থেকে জনবল নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে কাজ না করলে কোনোভাবেই আগস্টে এই হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হবে না। শিশুদের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। আইসিইউযুক্ত অ্যাম্বুলেন্সের চিন্তা করতে হবে। এ ছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতিও স্থাপন করতে হবে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে করলেও এসব কাজ শেষ করতে অন্তত ছয় মাস লাগবে। এরপর রয়েছে প্রতিদিন তিন বেলার খাবার। শিশুদের বিভিন্ন রোগের জন্য সরকার থেকে বিনামূল্যের ওষুধের ব্যবস্থা করতে হবে। এগুলোর কোনও প্রস্তুতি এখনও আমরা দেখছি না। এসব কারণে আগস্টে এটি প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এসব কিছু স্থাপন করা না গেলে শিশু হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু হবে না।’

জনবল চূড়ান্ত হয়নি

একই কথা বলেছেন বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা। তিনি জানিয়েছেন, হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণ হলেও পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক, বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য চিকিৎসক, টেকনোলজিস্টসহ ৫০০ জনবল লাগবে। লাগবে চিকিৎসা সরঞ্জাম। কিন্তু এখনও এসব জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। দুই প্রক্রিয়াই জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে ভবন হস্তান্তর হলেও হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা চালু হতে অন্তত আরও কয়েক মাস লাগবে; যদি দ্রুত সব কাজ হয়। না হলে এক বছরও লাগতে পারে।

এ ব্যাপারে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আব্দুল মোনায়েম সাদ বলেন, ‘আগে শিশু হাসপাতাল পরিচালনার জন্য শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওপর দায়িত্ব ছিল। কিন্তু সম্প্রতি এক নির্দেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই দায়িত্ব বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের ওপর দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন করে কী ধরনের জনবল লাগবে, কী কী চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন হবে; তা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতর থেকে জানানো হবে। তাদের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে।’

পরিচালনার দায়িত্বে বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগ

গত ১৭ মে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে এক পত্রে জানানো হয়, বরিশাল শিশু হাসপাতালের ভবন গ্রহণ, প্রশাসনিক অনুমোদন, পদ সৃজন, আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কাজ সমন্বয় এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে হাসপাতাল চালু করবে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগ।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল হাসান বলেন, ‘সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শিশু হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের ওপর দেওয়া হয়েছে। আমার জানামতে বরিশাল শিশু হাসপাতালের ভবন এখনও হস্তান্তর করা হয়নি। তবে হাসপাতালের সবকিছুর বিষয়ে দেখভাল করছেন জেলা সিভিল সার্জন।’

হাসপাতালটির ভবন বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব বরিশাল জেলার সিভিল সার্জন এস এম মঞ্জুর-ই-এলাহী বলেন, ‘হাসপাতাল হওয়ায় চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তার কাছে এটি হস্তান্তর করতে হবে। এজন্য হাসপাতাল ভবন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে আমরা চিঠি দিয়েছি। তবে এখনও ভবনের পানির লাইন, শয্যা, লিফট ও সাবস্টেশনের কাজ চলমান থাকায় হস্তান্তর হয়নি। হস্তান্তরের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবে এটি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

কবে নাগাদ ভবন হস্তান্তর

কত শতাংশ কাজ বাকি আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বহু কাজ বাকি আছে এখনও। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও পানির সাবস্টেশন নির্মাণ, শয্যা, লিফটের কাজসহ অন্যান্য কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, যা চলমান রয়েছে। আমার জানামতে চিকিৎসক আসবেন বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে। কী পরিমাণ জনবল লাগবে সে বিষয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতর তালিকা পাঠাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। এগুলো চূড়ান্ত হয়নি এখনও।’

কবে নাগাদ ভবন হস্তান্তর করা হবে জানতে চাইলে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম বলেন, ‘বর্তমানে অস্থায়ীভাবে বিদ্যুতের থ্রি ফেজ সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে হাসপাতালটি। এখন পানির সাবস্টেশন নির্মাণ, শয্যা, লিফট, জেনারেটর বসানোসহ কিছু কাজ বাকি আছে। যা চলতি জুন মাসের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করছি। এরপরই হস্তান্তর করবো।’

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব রফিকুল আলম বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে ভবন হস্তান্তরসহ বাকি যেসব কাজ রয়েছে সেগুলো সম্পন্ন করতে কয়েক মাস লাগতে পারে। সঙ্গে জনবলের নিয়োগ প্রক্রিয়া ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের বিষয়গুলো নিয়ে সামনে এগোতে হবে। আর বাইরে থেকে এনে চিকিৎসক ও জনবল দিয়ে এ ধরনের হাসপাতাল পরিচালনা করা ঠিক হবে না।’