যৌন হয়রানি মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ও সচেতনতার অভাব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, কারখানা কিংবা গণপরিবহন—যৌন হয়রানির খবর পেলে বাংলাদেশ কী করে? বাংলাদেশে যৌন হয়রানির অভিযোগ মোটাদাগে দুই চরম মেরুতে বাঁধা। একদিকে অভিযোগ ওঠামাত্র তথ্যপ্রমাণের অপেক্ষা না করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থন, তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে জনমানসের আবেগকে ভর করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রবণতা। অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্তকে ঢালাও ছাড়পত্র এবং ভুক্তভোগীকে ধিক্কার দেওয়া।
এই দুই মেরুর মাঝখানে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো অনলাইন ‘মব জাস্টিস’। অভিযোগ উঠলেই সংগঠিতভাবে কাউকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা, হুমকি দেওয়া কিংবা পরিবার পর্যন্ত আক্রমণের মুখে ফেলে দেওয়ার ঘটনা এখন নতুন কিছু নয়। এই প্রবণতা যেমন সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে না, তেমনি অভিযুক্তের ক্ষেত্রেও ন্যায্য প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়। এই দুই মেরুর মাঝখানে যে তদন্ত, নীতিমালা প্রণয়ন, তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন এবং ন্যায়বিচার প্রয়োজন, আমাদের সংকট সেখানটায়। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং একধরনের সমষ্টিগত অনাস্থা ও অস্থিরতার বশে আবেগ, অনুমান আর আক্রোশ অতিক্রম করে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা হতে পারে কম।
মেরুকরণের মধ্যে গুরুতর যেই প্রশ্ন হারিয়ে যায় তা হলো, ব্যক্তিগত অভিমান, ব্যক্তিচরিত্র, সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানসিক সংকট বা অন্য যেকোনো কারণেই যৌন হয়রানির প্রসঙ্গ উত্থাপিত হোক না কেন, তা জনপরিসরে বিচারের বিষয়বস্তু নয়। অভিযুক্তের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ যেমন তার অন্যায়ের প্রমাণ নয়, তেমনি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের অভাবও কোনোভাবেই প্রমাণ করে না যে তিনি কখনোই যৌন নিপীড়ক নন।
একসময় আমি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। সেখানে এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে আমি যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছিলাম। তিনি কর্মক্ষেত্রে আমার পথ আগলে দাঁড়াতেন, আমার রিকশা থামিয়ে উঠে পড়তেন, গাড়িতে পেছনে বসে আমার সিট ঝাঁকাতেন। অভিযোগ সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ তাঁকে কেবল ‘একজন দুষ্টু ছেলে’ বলে ছেড়ে দেয়; কারণ, তিনি আমার গায়ে হাত দেননি কিংবা মুখ ফুটে গালি দেননি। কর্তৃপক্ষ আসলে জানতই না যৌন হয়রানির পরিসীমা কী।
কারও বিরুদ্ধে যখন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে, তখন যেকোনো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকে স্পষ্ট, স্বাধীন ও প্রশিক্ষিত কমিটি গঠন করে অভিযোগ গ্রহণ, সাক্ষ্য সংগ্রহ, গোপনীয়তা রক্ষা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সময়মতো প্রতিবেদন প্রকাশ। কিন্তু বাংলাদেশে কয়টি প্রতিষ্ঠান এই দায়িত্ব পালন করেছে কিংবা আদৌ এই দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দায়সারা বিবৃতি দেওয়া কিংবা অভিযুক্তকে চাকরিচ্যুত করে গা বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো নীতিগত পরিবর্তন না এনে যৌন নিপীড়নের অনুকূল পরিবেশ নির্মূল করা সম্ভব নয়। ফলে আগামী দিনে অন্য কেউ একই পরিসরে যৌন নিপীড়নমূলক আচরণ করলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে আশা করা যায়। এবং একসময় যৌন নিপীড়ন সহজাত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। নারীর জন্য কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা তখন মুশকিল হয়ে যায়।
একসময় আমি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। সেখানে এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে আমি যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছিলাম। তিনি কর্মক্ষেত্রে আমার পথ আগলে দাঁড়াতেন, আমার রিকশা থামিয়ে উঠে পড়তেন, ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতেন, আমাকে শুনিয়ে নারীদের শরীর নিয়ে মন্তব্য করতেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে করার বাসনা প্রকাশ করতেন, গাড়িতে পেছনে বসে আমার সিট ঝাঁকাতেন। আমাদের মধ্যে কোনো ঘনিষ্ঠতা ছিল না, ছিল না কোনো ‘দুষ্টুমি’র সম্পর্কও। কিন্তু আমার অভিযোগ সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ তাঁকে কেবল ‘একজন দুষ্টু ছেলে’ বলে ছেড়ে দেয়; কারণ, তিনি আমার গায়ে হাত দেননি কিংবা আমাকে মুখ ফুটে গালি দেননি। কর্তৃপক্ষ আসলে জানতই না যৌন হয়রানির পরিসীমা কী।
বাংলাদেশে ২০০৯ সালে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেখানে অভিযোগ কমিটি গঠন, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং প্রতিকার প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান হয় এটি জানে না, নয়তো মানে না। কোথাও কমিটি নেই, কোথাও আছে কিন্তু অকার্যকর, কোথাও সদস্যরা প্রশিক্ষিত নন, কোথাও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আইনগত অস্পষ্টতা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা। যৌন হয়রানি–সংক্রান্ত নির্দেশনা ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর প্রয়োগে ঘাটতি থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানগুলো দায় এড়িয়ে যেতে পারে। ফলে দশকের পর দশক পার হয়ে যায়, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন হয় কম।
যৌন হয়রানিকে তাই শুধু ব্যক্তির আচরণ হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র ধরা পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির অভাব যৌন হয়রানির অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে এবং বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই পরিবেশ বদলাতে যৌন হয়রানি কী তা জানতে হবে এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সেফগার্ডিংকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ব্র্যাকসহ কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সেফগার্ডিং নিয়ে কাজ করছে। তারা হয়রানি কী, কীভাবে অভিযোগ নিতে হয়, কীভাবে তদন্ত করতে হয়, কীভাবে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে হয়, এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে থাকে। ব্র্যাকের সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স প্রোগ্রামের পরিচালক এ এফ এম শহিদুর রহমান বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির মতো অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার কিংবা ব্যক্তির ওপর দায় চাপিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা, ন্যায্যতা এবং উৎপাদনশীলতার পূর্বশর্ত একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ। সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার দায় প্রতিষ্ঠানের। একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো সুচিন্তিত ও অর্থবহ নীতিমালা মেনে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রশিক্ষিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করা এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া। সেই প্রক্রিয়াই কর্মক্ষেত্রে আস্থা তৈরি করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।’
সেফগার্ডিং বিশেষজ্ঞ জেনেফা জব্বার এই লেখককে বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের বুঝতে হবে যে শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা যথেষ্ট নয়। সেফগার্ডিংয়ের জন্য প্রয়োজন কিছু আচরণের সমন্বিত পরিবর্তন। দৈনন্দিন নানান ক্ষতিকর আচরণকে প্রশ্ন না করার ফলে অঘটন ঘটার অনেক আগেই ঝুঁকির বীজ রোপিত হয়। ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, টানাপোড়েন এবং মতবিরোধের মধ্য দিয়ে ঝুঁকি সৃষ্টি হতে শুরু করে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ায়। দুর্ঘটনা ঘটার পর অভিযোগ উত্থাপন করা সেই ক্ষতি নির্মূল করতে মোটেও যথেষ্ট নয়। হ্যাঁ, অভিযোগ উত্থাপন করা এবং আমলে নেওয়া জরুরি। তবে সেই তথ্য তখনই কাজে লাগে, যখন প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে আচরণগত পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’
একজন মানুষ দোষী কি নির্দোষ, তা সামাজিক মাধ্যমে বসে বিচার করার বিষয় নয়। প্রশ্ন যখন যৌন হয়রানি নিয়ে, তখন সচেতনতা, তথ্যপ্রমাণ, পদ্ধতিগত অনুসন্ধান এবং সংবেদনশীলতার বিকল্প নেই। সময় বদলেছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারীবান্ধব, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাধ্যতামূলক নীতিমালা, প্রশিক্ষিত তদন্ত কমিটি এবং জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে ব্যক্তি বদলাবে, নাম বদলাবে, প্রতিষ্ঠান বদলাবে, কিন্তু অন্যায় এবং বিচারহীনতার ফাঁক গলে মানুষের মর্যাদা ও প্রাণের অধিকার বারবার মুখ থুবড়ে পড়তে থাকবে।
*লেখক: তৃষিয়া নাশতারান: নারীবাদী সংগঠক ও হিউম্যান সেন্টারড ডিজাইন বিশেষজ্ঞ
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]



