টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিনের চাহিদা কমাতে পারে মেটফরমিন: নতুন গবেষণায় আশার আলো
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন চাহিদা কমাতে পারে মেটফরমিন

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিনের চাহিদা কমাতে পারে মেটফরমিন: নতুন গবেষণায় আশার আলো

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ টাইপ-১ ডায়াবেটিস নামক অটোইমিউন রোগে ভুগছেন, যেখানে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো ধ্বংস করে দেয়। এই অবস্থার ফলে শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি হয় না, রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং রোগীদের আজীবন ইনসুলিন ইনজেকশনের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়।

গবেষণায় উঠে এলো নতুন সম্ভাবনা

এমন চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ার গারভান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল রিসার্চের গবেষকরা একটি নতুন গবেষণা পরিচালনা করেছেন, যা টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আশার বার্তা বয়ে এনেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বহুল ব্যবহৃত ওষুধ মেটফরমিন টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের দৈনিক ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে সহায়তা করতে পারে।

এই গবেষণাটি ‘ইনটিমেট’ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ইন টাইপ-১ ডায়াবেটিস ম্যানেজড উইথ মেটফরমিন নামে পরিচিত, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৪০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেককে ছয় মাস ধরে মেটফরমিন ওষুধ প্রদান করা হয়, অন্যদিকে বাকি অর্ধেককে প্লাসেবো বা ডামি ওষুধ দেওয়া হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল

এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা. জেনিফার স্নেইথ ব্যাখ্যা করেন যে, টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স একটি অতিরিক্ত সমস্যা হিসেবে কাজ করে, যেখানে শরীর ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দেয়। এটি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তোলে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে গবেষণার ফলাফলে একটি আকর্ষণীয় দিক উঠে এসেছে: মেটফরমিন ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমাতে পারেনি, কিন্তু যারা এই ওষুধ গ্রহণ করেছেন তাদের দৈনিক ইনসুলিন ব্যবহারের পরিমাণ গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ইনসুলিন কমানো সত্ত্বেও রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে, এবং গড় গ্লুকোজ বা এইচবিএ১সি স্তরে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।

গবেষকরা ‘ক্ল্যাম্প’ টেস্টের মাধ্যমে লিভার, পেশি ও চর্বি কোষে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স পরিমাপ করেছিলেন। ২৬ সপ্তাহ পর ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এলেও, মেটফরমিন গ্রহণকারী গ্রুপে ইনসুলিনের দৈনিক ডোজ স্পষ্টভাবে কমেছে।

চিকিৎসকদের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ডা. স্নেইথ আরও উল্লেখ করেন, “ইনসুলিন একটি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ হলেও এটি রোগীদের জন্য শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই ইনসুলিনের ব্যবহার কমানো রোগীদের জীবনের মান উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য একটি ওষুধ যদি এই কাজটি করতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।”

তবে গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে, মেটফরমিন কীভাবে এই প্রভাব ফেলছে তা এখনো সম্পূর্ণরূপে বোঝা যায়নি। তাদের ধারণা, এই ওষুধটি সম্ভবত অন্ত্রের জীবাণু বা ‘গাট মাইক্রোবায়োম’-এর ওপর কাজ করে এই ফলাফল তৈরি করছে।

প্রফেসর জেরি গ্রিনফিল্ড বলেন, “মেটফরমিন প্রায় একশত বছর ধরে চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলেও এর সঠিক কার্যপ্রণালী এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। আমরা আশা করেছিলাম যে এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করবে, কিন্তু গবেষণায় ভিন্ন ফলাফল দেখা গেছে।”

বর্তমানে গবেষক দল টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরে মেটফরমিন কীভাবে গাট মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তন আনে তা নিয়ে আরও গভীর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভবিষ্যতে এই আবিষ্কার টাইপ-১ ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে এবং রোগীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই গবেষণাপত্রটি নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।