টুথপেস্ট গিলে ফেললে শরীরে কী ঘটে? ফ্লোরাইডের প্রভাব ও সতর্কতা
দাঁত মাজার সময় অসাবধানে খানিকটা টুথপেস্ট পেটে চলে যাওয়া একটি সাধারণ ঘটনা, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে। স্ট্রবেরি বা চকোলেট ফ্লেভারের টুথপেস্টের লোভে অনেক শিশু ইচ্ছা করেই এটি গিলে ফেলে, যা মা-বাবাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্ন জাগে, টুথপেস্ট কি আসলে বিষাক্ত? টুথপেস্ট গিলে ফেললে শরীরের ভেতরে ঠিক কী ঘটে? বিজ্ঞানের আলোকে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ফ্লোরাইড: টুথপেস্টের গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত উপাদান
টুথপেস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত উপাদান হলো ফ্লোরাইড। ফ্লোরাইড দাঁতের এনামেলকে শক্ত করে এবং ক্যাভিটি বা ক্ষয় রোধে সাহায্য করে। তবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফ্লোরাইড পেটে গেলে বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। তবে খুব বেশি ভয়ের কারণ নেই, কারণ বাংলাদেশের সব টুথপেস্টে ফ্লোরাইড থাকে না। সাধারণ দাঁত মাজার সময় যে সামান্য পরিমাণ ফ্লোরাইড পেটে যায়, তাতে বিষক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে। টক্সিকোলজির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো পদার্থের ক্ষতিকারক প্রভাব তার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে, ফ্লোরাইডের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই।
ফ্লোরাইডের বিষক্রিয়ার মাত্রা ও হিসাব
চিকিৎসাবিজ্ঞানের হিসেবে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তার শরীরের ওজনের প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ফ্লোরাইড সহ্য করতে পারে। এর বেশি হলেই কেবল শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি তিন বছর বয়সী শিশুর গড় ওজন প্রায় ১৫ কেজি। হিসেব অনুযায়ী, তার শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হতে হলে অন্তত ৭৫ মিলিগ্রাম ফ্লোরাইড পেটে যেতে হবে। ফ্লোরাইডযুক্ত সাধারণ টুথপেস্টে ফ্লোরাইড থাকে প্রায় ১০০০–১৫০০ পিপিএম, অর্থাৎ প্রতি গ্রামে আনুমানিক ১–১.৫ মিলিগ্রাম। এই হিসেবে ৭৫ মিলিগ্রাম ফ্লোরাইড পেতে শিশুকে খেতে হতে পারে প্রায় ৫০–৭৫ গ্রাম টুথপেস্ট, যা প্রায় অর্ধেক টিউবের সমান। তবে, টুথপেস্টের ব্র্যান্ড, ঘনত্ব ও টিউবের আকার অনুযায়ী এই হিসেব পরিবর্তন হতে পারে।
এটাও মনে রাখতে হবে, ৫ মিলিগ্রাম/কেজি কোনো সর্বোচ্চ সীমা নয়। অনেক শিশু বা মানুষের ক্ষেত্রে এর নিচেও হালকা লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন, ১৫ কেজির শিশু যদি মাত্র ০.৫ মিলিগ্রাম/কেজি গ্রহণ করে, তাহলেও বমি বা পেটব্যথা হতে পারে। অর্থাৎ মাত্র ৭.৫ মিলিগ্রামেই উপসর্গ শুরু হতে পারে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন শিশুরোগ সংস্থা তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ফ্লোরাইড মুক্ত বা খুবই কম ফ্লোরাইডের টুথপেস্ট ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। অন্যদিকে, ৫০ থেকে ৬০ কেজি ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে বিষক্রিয়ার জন্য এক বসায় অন্তত দেড় থেকে দুটি আস্ত টুথপেস্টের টিউব শেষ করতে হবে, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। সুতরাং, প্রতিদিনের সাধারণ ব্যবহারের সময় সামান্য টুথপেস্ট গিলে ফেলা নিয়ে খুব বেশি আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই, তবে অতিরিক্ত খেয়ে ফেললে সতর্ক হতে হবে।
ফ্লোরাইড কেন বিপজ্জনক হতে পারে?
ফ্লোরাইড কেন বিপজ্জনক হতে পারে, সেই কারণটি জানা জরুরি। অতিরিক্ত ফ্লোরাইড পাকস্থলীতে প্রবেশ করলে তা পাকস্থলীর অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে। আমাদের পাকস্থলীতে থাকে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl), এর সঙ্গে ফ্লোরাইড বিক্রিয়া করে তৈরি হয় হাইড্রোফ্লোরিক অ্যাসিড (HF)। এটি দুর্বল কিন্তু খুবই বিপজ্জনক অ্যাসিড, কারণ এটি চর্বিতে দ্রবণীয় এবং কোষের ঝিল্লি ভেদ করে সহজেই ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এই অ্যাসিড পাকস্থলীর দেয়ালে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে, ফলে বমি, বমি বমি ভাব, পেটব্যথা এবং অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ হতে পারে।
আবার, ফ্লোরাইডের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো এটি ক্যালসিয়ামের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। তাই আমাদের শরীরে অতিরিক্ত ফ্লোরাইড প্রবেশ করলে, তা রক্তে থাকা ক্যালসিয়ামের সঙ্গে নিজেকে আটকে ফেলে, ফলে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় মুক্ত ক্যালসিয়ামের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে থাকে। ক্যালসিয়াম কেবল হাড় বা দাঁতের জন্যই নয়, বরং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে এবং স্নায়বিক সংযোগ সচল রাখতেও অপরিহার্য। তাই শরীরের ক্যালসিয়ামের স্তর মারাত্মকভাবে নিচে নেমে গেলে শ্বাসকষ্ট বা হৃদযন্ত্রের ছন্দে অনিয়ম দেখা দিতে পারে, তবে এটি কেবল চরম পর্যায়ের ফ্লোরাইড ওভারডোজের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ফ্লোরোসিস
শুধু একদিনে অনেকখানি টুথপেস্ট খাওয়া নয়, দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ফ্লোরাইড গ্রহণ করাও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, একে ফ্লোরোসিস বলা হয়। ছোটবেলায় দাঁত গঠনের সময় যদি শিশু অতিরিক্ত ফ্লোরাইড গ্রহণ করে, তাহলে তার দাঁতের ওপর সাদাটে বা খয়েরি দাগ পড়ে যেতে পারে, যা পরবর্তী জীবনে স্থায়ী হয়ে যায়।
ফ্লোরাইড বিষক্রিয়ার লক্ষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা
কখনো যদি সন্দেহ হয়, শিশু বা পরিবারের কেউ অনেকখানি টুথপেস্ট খেয়ে ফেলেছে, তাহলে কিছু উপসর্গের দিকে কড়া নজর রাখা উচিত। ফ্লোরাইড বিষক্রিয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, মুখ দিয়ে লালা পড়া এবং প্রচণ্ড তৃষ্ণা। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে একটি চমৎকার ঘরোয়া প্রাথমিক চিকিৎসা আছে, যা জাদুর মতো কাজ করে: এক গ্লাস দুধ। কেউ যদি অতিরিক্ত ফ্লোরাইড খেয়ে ফেলে, তাহলে তাকে দ্রুত দুধ পান করানো উচিত। দুধের মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, যা পাকস্থলীতে পৌঁছালে অতিরিক্ত ফ্লোরাইডকে নিজের সঙ্গে আটকে ফেলে, ফলে ফ্লোরাইড রক্তে মিশে যাওয়ার সুযোগ পায় না এবং শরীর থেকে বের হয়ে যায়।
টুথপেস্ট ব্যবহারে সতর্কতা
টুথপেস্ট নিয়ে বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, শিশুদের দাঁত মাজার সময় মটর দানার মতো সামান্য টুথপেস্ট ব্যবহার করা উচিত, আর দুই বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে চালের দানার মতো ক্ষুদ্র পরিমাণই যথেষ্ট। আরেকটা কথা মনে রাখা দরকার, শিশুদের এমন ফ্লেভারের টুথপেস্ট দেওয়া উচিত নয়, যেগুলো তাদের খেয়ে ফেলতে প্ররোচিত করে। টুথপেস্ট কোনো খাবার নয়, এটি একটি ওরাল হাইজিন প্রোডাক্ট, যা দাঁতের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হয়েছে, পেটে যাওয়ার জন্য নয়। সঠিক পরিমাণে ব্যবহার করলে এটি পরম বন্ধু, কিন্তু অপব্যবহারে এটি ঝুঁকির কারণ হতে পারে।



