রংপুরে সিজার অপারেশনে চিকিৎসকদের গুরুতর অবহেলার অভিযোগ
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় এক প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশনের সময় পেটে গজ ও ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করার মর্মান্তিক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় গাইনি চিকিৎসক রাজিয়া বেগম মুক্তার বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় দীর্ঘ ৪২ দিন ধরে তীব্র যন্ত্রণা ও শারীরিক কষ্ট নিয়ে জীবনযাপন করছেন বড় আমবাড়ি গ্রামের গৃহবধূ হাবিবা জান্নাত।
ভুক্তভোগীর বর্ণনায় অপারেশন পরবর্তী যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা
হাবিবা জান্নাত বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'গত ৮ মার্চ নগরীর বন্ধন জেনারেল হাসপাতালে আমার সিজার অপারেশন করেন গাইনি চিকিৎসক রাজিয়া বেগম মুক্তা। অপারেশনের পর থেকেই আমি তীব্র পেট ব্যথা ও অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগছি, রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারি না।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সমস্যা নিয়ে যখন তিনি চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তাকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে ধরা পড়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য: পরীক্ষার ফলাফলে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, হাবিবা জান্নাতের পেটের ভিতরে অপারেশনের সময় ব্যবহার করা গজ ও ব্যান্ডেজ রয়ে গেছে। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসক রাজিয়া বেগম মুক্তা এই ঘটনাটি গোপন রাখতে চেষ্টা করছেন এবং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করছেন।
অন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ও স্বামীর বক্তব্য
হাবিবা জান্নাত বলেন, 'আমি পরে অন্য একজন গাইনি চিকিৎসককে আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট দেখালে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, সিজার অপারেশনের সময় গজ ও ব্যান্ডেজ রেখে দিয়েই সেলাই করে দেওয়া হয়েছে। তিনি অবিলম্বে অপারেশন করে পেট থেকে এই বস্তুগুলো বের করার জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন।'
ভুক্তভোগীর স্বামী শাওন মিয়া এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, 'আমরা বিষয়টি ডাক্তার রাজিয়া বেগম মুক্তাকে জানিয়েছি, কিন্তু তিনি কোনো গুরুত্বই দেননি। বরং তিনি আমাদের হুমকি দিচ্ছেন এবং কিছু টাকা নিয়ে চুপচাপ থাকতে বলছেন। এখন আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি, আমার স্ত্রী যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।' তিনি দৃঢ়ভাবে দাবি করেন যে, দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের উচিত এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
চিকিৎসকের প্রতিক্রিয়া ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ঘটনাটি তদন্তের জন্য সান ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অবস্থিত চিকিৎসক রাজিয়া বেগম মুক্তার চেম্বারে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে কল করলে তার এক সহযোগী সংক্ষিপ্তভাবে জানান, 'ম্যাডাম বর্তমানে রোগী দেখছেন, পরে কথা বলবেন।' এরপরই সংযোগ কেটে দেওয়া হয়।
রংপুরের জেলা সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা এই ঘটনায় তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, 'আমরা এই অভিযোগটি গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। তদন্ত করে নিশ্চিত হতে হবে যে, এখানে চিকিৎসকীয় দায়িত্বে কোনো অবহেলা বা লঙ্ঘন হয়েছে কি না। ভুক্তভোগী যদি আমাদের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ দাখিল করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'ঘটনাটি যদি সত্য হয়, তবে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। একজন গাইনি চিকিৎসকের পক্ষে এমন দায়িত্বহীনতা ও অবহেলা কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। চিকিৎসা সেবায় সর্বোচ্চ সততা ও নৈতিকতা বজায় রাখা অত্যাবশ্যক।'
এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং চিকিৎসা সেক্টরে জবাবদিহিতা ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার দাবি উঠছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন আক্রান্ত পরিবার ও স্থানীয় জনগণ।



