রাজধানীর আদদ্বীন হাসপাতালের অবহেলায় মৃত ছয় নবজাতক শিশুর পরিবারকে সারা জীবন ফ্রি চিকিৎসা, পরিবারের সদস্যদের চাকরি এবং বিনামূল্যে মেডিক্যাল শিক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির লিগ্যাল টিমের সদস্য আইনজীবী শিশির মনির। শনিবার (৬ জুন) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের পক্ষ থেকে নেওয়া নানা পদক্ষেপ তুলে ধরেন তিনি।
হাসপাতালের পদক্ষেপ
শিশির মনির বলেন, এখন পর্যন্ত ওই হাসপাতালে এ ঘটনার মতো আর কোনও দুর্ঘটনা একবারও সংঘটিত হয়নি। এই ঘটনায় হাসপাতাল পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। তারা তদন্ত করেছে। ইতোমধ্যে ওই সেকশনগুলোতে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক কন্ডাক্টেড একটি তদন্ত প্রতিবেদন আমাদের কাছে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে আদদ্বীন হাসপাতাল এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পাশে আজীবন দায়িত্ব পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ভুক্তভোগীদের জন্য প্রস্তাব
তিনি বলেন, প্রথমত, ভুক্তভোগী পরিবারের কোনও সদস্য অর্থাৎ মা-বাবা কিংবা ভাই-বোন যতদিন জীবিত থাকবেন তারা আদদ্বীন হাসপাতালে সব রোগের ফ্রি চিকিৎসা পাবেন, ওষুধ ছাড়া। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের মেডিক্যাল কলেজে কোনও উপযুক্ত ছাত্র যদি থাকে এই পরিবারের, তারা বিশেষ বৃত্তিতে এই মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পড়াশোনা করতে পারবেন। এছাড়াও এই পরিবারগুলোর কেউ যদি মনে করেন তারা উপযুক্ত, তাহলে হাসপাতাল সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে তারা চাকরি পাওয়ার হকদার হবেন। আদদ্বীন হাসপাতাল মনে করে, এই ঘটনার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে একটি সম্মানজনক এবং রেসপেক্টফুল পজিশনে ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করবে।
অবহেলা ও আইনি প্রক্রিয়া
শিশির মনির দাবি করেন, ভুক্তোভোগী পরিবারের কাছে প্রাপ্ত তথ্য এবং দুটো তদন্ত প্রতিবেদন একসঙ্গে পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের পক্ষ থেকে কমেন্ট হলো, ‘এটি একটি অনিচ্ছাকৃত অবহেলার ফল এবং ভুক্তোভোগী পরিবার এবং আদদ্বীন হাসপাতাল একসঙ্গে মনে করে, এই ঘটনার জন্য হাসপাতাল যেন পরিপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং বন্ধ না হয়। এ বিষয়ে সবাই একমত। কিন্তু যে বা যার অবহেলার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে সে বা তার উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপও তারা দাবি করেন। এছাড়াও তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের কোনও ঘটনা না ঘটে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শুধু আদদ্বীন হাসপাতালে নয়, বাংলাদেশেই যেন ভবিষ্যতে এরকম কোনও ঘটনা না ঘটে এ বিষয়ে কনসার্ন অথরিটির কাছেও তারা কথা বলেছেন এবং এরকম পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত প্রতিবেদন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে এবং আদদ্বীন হাসপাতালকে তারা ৭২ ঘণ্টার ভেতরে কারণ দর্শাতে বলেছেন, যে কেন হাসপাতালের লাইসেন্স ক্যানসেল করা হবে না। আগামীকাল বিকাল ৫টার মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য চিঠি পাঠিয়েছে। ওটা যেহেতু একটা লিগ্যাল প্রসেস এটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিগ্যালি মোকাবিলা করবে।
আইনি মোকাবিলা
তিনি বলেন, যে আইনের অধীনে তারা এই নোটিশ দিয়েছেন ওই আইন অনুযায়ী এটিকে মোকাবিলা করা হবে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অতীতে আমরা রিসার্চ করে দেখেছি, ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর ভারতের উত্তরপ্রদেশের জানসি জেলার এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে ১০ জন শিশু অপ্রত্যাশিতভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল। একইসঙ্গে ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর ভারতের জয়পুর রাজ্যে আইসিইউতে একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। এটাও ছিল অপ্রত্যাশিত।
হাসপাতালের সেবা
তিনি আরও বলেন, সবার একসঙ্গে কথা হলো আদদ্বীন হাসপাতাল অন্যান্য জায়গার চেয়ে আনুপাতিক হারে ৫০ থেকে ৭০ ভাগ কম খরচে চিকিৎসা দিয়ে থাকে। আজ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ মানুষকে ফ্রি চিকিৎসা দিয়েছে। যা ঘটেছে এটার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মর্মাহত। আমরা মনে করি, বিষয়টি সামনে রেখে আদদ্বীন হাসপাতাল ভুক্তভোগীর পরিবারের পাশে থাকবে। একইসঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবার মনে করে, হাসপাতালের সেবা কন্টিনিউ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু উপযুক্ত ব্যক্তির উপযুক্ত কারণে সুনির্দিষ্টভাবে উপযুক্ত শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এই বিষয়ে আদদ্বীন কর্তৃপক্ষ একমত। ইতোমধ্যেও আদদ্বীন কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
শিশির মনির বলেন, আমরা কেউই জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবো না, জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। কিন্তু মানুষের পক্ষে যা যা করণীয় সম্ভব তা সবকিছু করার জন্য উই আর রেডি।



