হামে আক্রান্ত ৯ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসার আশায় ঝিনাইদহ থেকে গতকাল শনিবার (২৩ মে) ঢাকায় এসেছেন পারভেজ হোসেন। এরপর এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেও এখন পর্যন্ত কোথাও ভর্তি করাতে পারেননি তিনি। রাত কাটিয়েছেন রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনের করিডোরে। আজ সকাল থেকেও তিনি অপেক্ষা করছেন একটি বেডের আশায়; যেখানে সন্তানকে রেখে চিকিৎসা শুরু করা যাবে। তবে সেটি নির্ভর করছে অন্য কোনো রোগীর ছাড়পত্রের ওপর।
হাসপাতালে ভর্তি করাতে ব্যর্থ
রবিবার (২৪ মে) শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে সন্তান কোলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় পারভেজ হোসেনকে। সঙ্গে ছিলেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। পারভেজ হোসেন বলেন, হাম, জ্বর ও নিউমোনিয়া নিয়ে গতকালই ঢাকায় আসেন তারা। হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসকেরা ভর্তি করানোর পরামর্শ দিলেও কোনো সিট খালি ছিল না। এরপর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঘুরেও কোথাও ভর্তি করাতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘আমরা ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে প্রায় ২০ দিন ছিলাম। সেখানে জ্বর, নিউমোনিয়া, হাম ও টাইফয়েড ধরা পড়ে। পরে রাজশাহী বা খুলনায় নেওয়ার কথা বলা হয়। এরপর এই শিশু হাসপাতালে আসি। ভেবেছিলাম এখানে জায়গা পাব, কিন্তু পাইনি। সারারাত করিডোরেই ছিলাম।’ সিট না পেলে কী করবেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তখন আর কী করা… বাড়ি ফিরে যাব। ডাক্তার যদি কোনো পরামর্শ দেন, সেটা নিয়েই ফিরে যাব।’
একই ভোগান্তি অন্যান্য অভিভাবকদেরও
একই ভোগান্তির কথা জানান কুষ্টিয়া থেকে আসা মাকসুদা হালিম। তিনি সাড়ে তিন মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে এসেছেন। শিশুটির শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া রয়েছে বলে জানান তিনি। মাকসুদা বলেন, ‘কুষ্টিয়ায় ভর্তি ছিল, কিন্তু সেখানে আইসিইউ ছিল না। পরে গতকাল রাত ৯টায় ঢাকায় এসে শিশু হাসপাতালে আসি। কিন্তু এখানে সিট পাইনি। আমাদের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পরে ঢাকা মেডিক্যালে পাঠানো হয়। সেখানেও আইসিইউ খালি নেই বলে জানায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা মেডিক্যাল থেকে বলা হয়, অক্সিজেনের অভাবে বাচ্চা মারা গেলে দায়ী থাকবে না—এমন লিখিত দিতে। পরে আবার শিশু হাসপাতালে ফিরে আসি। এখন দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছে।’
ময়মনসিংহ থেকে আসা শারমিন শিলাও একই অবস্থার কথা জানান। তিনি তার ভাইয়ের ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে এসেছেন, যার মা জন্মের সময় মারা গেছেন। শারমিন বলেন, ‘হাম, নিউমোনিয়া, পাতলা পায়খানা ও জ্বর নিয়ে এসেছি। ময়মনসিংহ মেডিক্যালে ৯ দিন ভর্তি ছিল, পরে আরেক হাসপাতালে ৮ দিন রাখা হয়। সেখান থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়। এখন এখানে সিট নেই বলে ঢাকা মেডিক্যাল বা সোহরাওয়ার্দীতে যেতে বলেছে।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এদিকে সিট না পেয়ে রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক ডা. মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘তাদের হাসপাতাল সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।’ তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট বেড ও মেশিনের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। ১০টি মেশিন থাকলে ১৫টি বসানো যায় না। তবে আমরা চেষ্টা করি কোনো রোগীকে ফেরত না দিতে। বড় হাসপাতালগুলোতেও ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী এলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।’
রোগীর চাপ কমেছে কি না—এমন প্রশ্নে হামের ওয়ার্ডে দায়িত্বরত এক চিকিৎসক বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকার বাইরে চিকিৎসা ব্যবস্থা কিছুটা উন্নত হওয়ায় চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এখনো চারটি ওয়ার্ডে হামের রোগী ভর্তি আছে এবং কোথাও কোনো সিট ফাঁকা নেই।’
অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা
অন্যদিকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অভিভাবকরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সন্তান কবে সুস্থ হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা তাদের। পুরান ঢাকা থেকে আসা সুমাইয়া আক্তার বলেন, তার ৫ মাস বয়সী সন্তান জ্বর, ঠান্ডা ও হামে আক্রান্ত হয়ে দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছে। চিকিৎসা চলছে, তবে অবস্থা সম্পর্কে এখনো কিছু জানানো হয়নি। নরসিংদী থেকে আসা মুসলিমা জানান, তার চার মাস বয়সী শিশুর নিউমোনিয়া হয়েছে এবং ফুসফুসে সংক্রমণ রয়েছে। ঈদের ছুটিতে চিকিৎসা সেবা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
ঈদের ছুটিতে সেবা অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি
এদিকে ঈদের ছুটিতেও চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখতে বিশেষ প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উপ-পরিচালক ডা. মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, ছুটির সময়েও জরুরি সেবা চালু রাখতে রোস্টার করা হয়েছে। সকাল, বিকাল ও রাত; সব সময়েই চিকিৎসক ও নার্সরা দায়িত্ব পালন করবেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানও অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে বর্তমানে হামে আক্রান্ত প্রায় ১০৪ জন শিশু ভর্তি রয়েছে বলেও জানান তিনি।



