দেশে হামে ৭০০ শিশুর মৃত্যু, ৮৬ হাজার ভর্তি
দেশে হামে ৭০০ শিশুর মৃত্যু, ৮৬ হাজার ভর্তি

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সাতশোর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৬ হাজারের বেশি রোগী। গুরুতর রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জ্বর, র্যাশ, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতা নিয়ে শিশুরা রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে আসছে। স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা নিয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শেষ ভরসা হিসেবে ঢাকায় ছুটে আসছেন অনেক অভিভাবক। তবে রাজধানীতে এসেও বেড সংকটে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।

শুক্রবার শ্যামলী শিশু হাসপাতালের চিত্র

শুক্রবার (৩ জুলাই) রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। হাসপাতালের হামের জন্য নির্ধারিত সব ওয়ার্ডের বেড রোগীতে পূর্ণ। কোনো কোনো রোগীকে বেড না পেয়ে অন্য হাসপাতালে যেতে হয়েছে। হাসপাতালে আসা রোগীদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের বেশিরভাগই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। স্থানীয় চিকিৎসায় সন্তুষ্ট না হওয়া কিংবা সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে তারা রাজধানীমুখী হয়েছেন।

জটিল রোগী কমলেও আক্রান্তের সংখ্যা কমেনি

হাসপাতালের চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা জানান, জটিল রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেনি। রাজধানীমুখী রোগীদের স্থানীয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েও অনেক শিশুর অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। কারও জ্বর কমছে না, কারও শ্বাসকষ্ট বাড়ছে, আবার কারও শরীরে দেখা দিচ্ছে হামের লক্ষণ। এমন পরিস্থিতিতে উন্নত চিকিৎসার আশায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ছুটে আসছেন অভিভাবকরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জ্বর, ঠান্ডা ও টাইফয়েড নিয়ে কুমিল্লা থেকে শিশুকে নিয়ে এসেছিলেন সাইফুল ইসলাম। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকায় এলেও শিশু হাসপাতালে কোনো সিট পাননি। তিনি বলেন, “বাচ্চার অনেক জ্বর-ঠান্ডা, আবার টাইফয়েড হয়েছে। এলাকার ডাক্তার বলেছে ঢাকায় নিয়ে আসতে। পরে এখানে আসলাম। কিন্তু সিট পেলাম না। আমাদের বললো এখন সোহরাওয়ার্দী যেতে। এখন ওই হাসপাতালেই যাচ্ছি, দেখি কী হয়।”

মিরপুরের মাসুদের পাঁচ মাসের শিশু আইসিইউতে ১২ দিন

হাসপাতালে কথা হয় মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মাসুদের সঙ্গে। তার পাঁচ মাস বয়সী সন্তানকে গত মাসের ১৮ তারিখে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটি আইসিইউতে ১২ দিন চিকিৎসা নিয়েছে। মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, “আমার বাচ্চার বয়স পাঁচ মাস। আমাদের গ্রামের বাড়ি শিবচরে, তবে আমি মিরপুরে থাকি। বাচ্চা বর্তমানে অনেকটাই সুস্থ। গত মাসের ১৮ তারিখে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। সে আইসিইউতে ছিল এবং সেখানে ১২ দিন চিকিৎসা নিয়েছে। পরে ১ তারিখে আইসিইউ থেকে বের করা হয়। এখন অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে, তবে শ্বাসকষ্ট আছে।”

তিনি জানান, প্রথমে শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। সাত দিন চিকিৎসার পর বাসায় ফিরলেও কয়েকদিন পর আবার জ্বর দেখা দেয়। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন টিকার কারণে জ্বর এসেছে। কিন্তু পরে শরীরে দানা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মাসুদ বলেন, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শ্বাসকষ্ট কমে গেলে এবং সব রিপোর্ট ভালো থাকলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। তবে এখনো মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে কিছুটা সমস্যা দেখা যায়।

বরিশাল থেকে সাব্বিরের ছয় মাসের মেয়ে

বরিশাল থেকে ছয় মাস ২৩ দিন বয়সী মেয়েকে নিয়ে এসেছেন মো. সাব্বির হাওলাদার। শিশুটির অসুস্থতা শুরু হয় প্রায় এক সপ্তাহ আগে। প্রথমে টাইফয়েড ধরা পড়ে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করানো হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে তাকে ঢাকায় আনা হয়। সাব্বির হাওলাদার বলেন, “আমরা বরিশাল থেকে এসেছি। প্রায় ছয়-সাত দিন আগে আমার মেয়ের অসুস্থতা শুরু হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিয়ে ঢাকায় আসি। প্রথমে টাইফয়েড ধরা পড়েছিল। বরিশালে চিকিৎসা করানো হয়েছিল, কিন্তু সেখানে আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা খুব একটা নেই। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ও ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে শিশুটিকে গতকাল বিকেলে ঢাকায় নিয়ে আসি। ঢাকায় আসার পর অনেক কষ্টে একটি সিট পেয়েছি। বর্তমানে তাকে অক্সিজেন ও স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন পরীক্ষাও চলছে।”

তিনি বলেন, “এখন হাসপাতালে যেসব শিশু ভর্তি আছে, তাদের অনেকেরই অবস্থা খুব খারাপ। গত বছর এমন পরিস্থিতি ছিল না। প্রতিদিনই অনেক শিশু ভর্তি হচ্ছে। কেউ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে, আবার কেউ আইসিইউতে যাচ্ছে। মা-বাবার জন্য এটি খুবই কষ্টের বিষয়। একটি সুস্থ-সুন্দর শিশুকে হঠাৎ এমন অবস্থায় দেখতে খুব খারাপ লাগে।”

ধামরাই থেকে আল মামুনের সাত মাসের শিশু

ধামরাই থেকে সাত মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন আল মামুন চৌধুরী। প্রথমে শিশুটির ঠান্ডা ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা হামের লক্ষণ শনাক্ত করে ঢাকায় পাঠান। আল মামুন বলেন, “বাচ্চার প্রথমে ঠান্ডার সমস্যা ছিল। পরে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। ১৩ তারিখ থেকে চিকিৎসা শুরু হয় এবং সে এক সপ্তাহ হাসপাতালে ভর্তি ছিল। শনিবার তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তখন কিছুটা সুস্থ হওয়ায় বাসায় নিয়ে যাই। পরে আবার অসুস্থ হলে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসি। সকালে ডাক্তার ভালোভাবে পরীক্ষা করে কানের নিচে এবং মুখের ভেতরে লক্ষণ দেখে বলেন, এটি হামও হতে পারে। তখন জানান, এখানে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা চলছিল, কিন্তু হামের লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। এরপর ওকে ভর্তি করা হয়।”

মানিকগঞ্জ থেকে রেজাউলের ছয় মাসের মেয়ে

মানিকগঞ্জ থেকে ছয় মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে এসেছেন মো. রেজাউল। তিনি বলেন, “আমার মেয়ের হাম হয়েছিল। এখানে আনার পর হাসপাতালে একটি সিট পেয়েছি এবং চিকিৎসা চলছে। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, হামের সমস্যা এখন অনেকটাই কেটে গেছে। তবে এখনো শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে। আগে জ্বর ছিল, কিন্তু বর্তমানে জ্বর নেই। আগের তুলনায় অবস্থার উন্নতি হয়েছে।”

জটিল রোগী কমলেও কমেনি রোগীর চাপ

সম্প্রতি গুরুতর রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেনি। হাসপাতালের কোনো বেডই খালি নেই। রোগীদের অবস্থা সম্পর্কে দায়িত্বরত এক নার্স বলেন, “সিরিয়াস রোগীর সংখ্যা কমেছে, কিন্তু রোগীর সংখ্যা কমেনি। হামের উপসর্গ বা র্যাশ নিয়ে অনেক রোগী আসছে। রোগী কমে গেলে তো বেড ফাঁকাই থাকত। আমাদের কোনো বেডই ফাঁকা নেই, সব পূর্ণ।”

নার্স সুপারভাইজার বলেন, “আমাদের এখানে এখন পর্যন্ত (বিকেল ৪টা পর্যন্ত) ৮৯ জন হামের রোগী ভর্তি আছে। কোনো ফাঁকা বেড নেই। আমাদের কখনো বেড ফাঁকা থাকে না। আজ শুক্রবার বলে রোগীর চাপ একটু কম।”

ডেঙ্গুর চাপ এখনো কম

হামের রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেলেও ডেঙ্গুর রোগীর চাপ এখনো তেমনভাবে পড়েনি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। বরং অন্য রোগে আক্রান্ত শিশুই বেশি। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে কর্মরত এক নার্স বলেন, “এটি ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ড। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট বেড রাখা আছে। ডেঙ্গু রোগী মোটামুটি আসছে, তবে সেভাবে চাপ নেই। সাধারণত পাঁচ-ছয়জন রোগী ভর্তি থাকে। কখনো সাত-আটজন পর্যন্ত হয়। তবে এই সংখ্যা খুব বেশি না।”

নার্স সুপারভাইজার বলেন, “বর্তমানে আমাদের এখানে আটজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে। আপাতত ডেঙ্গুর চাপ নেই, যা আছে হামের। এই চাপ কম থাকায় রক্ষা হয়েছে। যদি হামের মতো ডেঙ্গুর চাপ হলে আমাদের বড় বিপদের মুখে পড়তে হতো।”