চিকিৎসাবিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন ভারতের হায়দরাবাদের খ্যাতনামা সার্জন ডা. পি. রঘু রাম। ইন্টারেক্টিভ বা দ্বিমুখী যোগাযোগে সক্ষম এআই-চালিত হলোগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শ্রোতামণ্ডলীর উদ্দেশ্যে স্তন স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বক্তব্য রেখে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, গত ১৫ মাসের মধ্যে এটি ডা. রঘু রামের তৃতীয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড, যা জনস্বাস্থ্য শিক্ষার ইতিহাসে একটি বিরল দৃষ্টান্ত। রেকর্ড গড়া এই অনুষ্ঠানে ডা. রঘু রামের একটি ডিজিটাল এআই হলোগ্রাম বা ভার্চুয়াল অবতার উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে স্তন স্বাস্থ্য, স্তন ক্যানসার এবং এর স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক সনাক্তকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদান করে।
শুধু তাই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এই ভার্চুয়াল শিক্ষক ইংরেজি, হিন্দি, তেলুগু এবং তামিলসহ একাধিক ভাষায় শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের সরাসরি উত্তরও দেয়। এআই-সক্ষম হলোগ্রাম ভিত্তিক স্বাস্থ্য শিক্ষার ক্ষেত্রে এই প্রথম গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের নতুন একটি ক্যাটাগরি তৈরি করে এই সম্মাননা প্রদান করা হলো।
২৪ ঘণ্টা সহায়তায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘নারী’
অনুষ্ঠানমঞ্চ থেকে স্তন স্বাস্থ্যের জন্য ‘নারী’ নামক একটি এআই-চালিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শুভ সূচনা করা হয়। এই প্ল্যাটফর্মটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করবে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় স্তন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত যেকোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে প্রমাণভিত্তিক সঠিক নির্দেশনা ও সমাধান পাবেন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও অবহেলিত অঞ্চলের নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব দূর করতে এটি বড় ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের চেয়ারম্যান ডা. অভিজাত শেঠ এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘এটি কেবল একটি রেকর্ড নয়, বরং এটি একটি জনস্বাস্থ্যমূলক উদ্ভাবন যা অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে।’ ডা. রঘু রাম এই ঐতিহাসিক সম্মানটি তার প্রয়াত মা ডা. উষালক্ষ্মীকে উৎসর্গ করেছেন, যিনি নিজে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্তন ক্যানসার জয়ী ছিলেন। আবেগঘন কণ্ঠে ডা. রঘু রাম বলেন, ‘সচেতনতা, প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং আশাই পারে জীবন বাঁচাতে।’
তিনি স্পষ্ট করেন যে, রেকর্ড গড়া তার মূল লক্ষ্য ছিল না; দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা যাতে ভাষা বা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য পান, সেটিই তার আসল উদ্দেশ্য। কিমস হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. ভাস্কর রাও জানান, জনসচেতনতা বাড়াতে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়, এই উদ্যোগ তারই এক অনন্য উদাহরণ।
ভারতে স্তন ক্যানসারের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ
এই অর্জন প্রসঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডা. রঘু রাম ভারতে স্তন ক্যানসারের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে তুলনামূলক কম বয়সি নারীদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যাচ্ছে, যার মূল বয়সসীমা ৪০ থেকে ৫০ বছর। তিনি বলেন, ‘ভারতে প্রতি চার মিনিটে একজন নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং প্রতি আট মিনিটে একজন নারী এই রোগে মারা যান। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ই এর অন্যতম সেরা নিরাময়।’
তিনি আরও জানান, সচেতনতার অভাব, সামাজিক ট্যাবু এবং সুসংগঠিত স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের অনুপস্থিতির কারণে প্রায় ৬০ শতাংশ নারীই একদম শেষ বা অ্যাডভান্সড স্টেজে হাসপাতালে আসেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ডা. রঘু রাম ভারতে একটি শক্তিশালী ‘ন্যাশনাল ক্যানসার রেজিস্ট্রি’ এবং ‘জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন’-এর অধীনে সুসংগঠিত স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালুর ওপর জোর দেন। ভারতের অনেক ক্যানসার আক্রান্তের তথ্য এখনো নথিবদ্ধ হয় না উল্লেখ করে তিনি ডেটা সংগ্রহের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং ক্যানসার স্ক্রিনিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে স্বাগত জানান। উদাহরণ হিসেবে তিনি তেলেঙ্গানার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে জনসংখ্যা-ভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের কারণে শেষ ধাপের ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
এক নজরে ডা. পি. রঘু রাম
২০০২ সালে মায়ের ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ২০০৭ সালে হায়দরাবাদে তিনি ‘উষালক্ষ্মী ব্রেস্ট ক্যানসার ফাউন্ডেশন’ এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সমন্বিত স্তন রোগ চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলেন ডা. পি. রঘু রাম। সিদ্ধার্থ মেডিকেল কলেজের এই সাবেক শিক্ষার্থী ১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্য থেকে এফআরসিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। গত দুই দশক ধরে স্তন ক্যানসার সচেতনতায় অনন্য অবদানের জন্য ২০১৫ সালে ভারত সরকার তাকে সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।



