মুম্বাইয়ের পাইধোনি এলাকায় গত ২৬ এপ্রিল ভোরে একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রাথমিকভাবে তরমুজ খেয়ে বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর কথা ভাবা হলেও ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এর নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী ইঁদুর মারার বিষ ‘জিঙ্ক ফসফাইড’।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, নিহতদের ভিসেরা বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জিঙ্ক ফসফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গত ২৫ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়দের সঙ্গে বিরিয়ানি খেয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিরিয়ানি খেয়ে অন্য কোনো আত্মীয় অসুস্থ হননি। রাত ১টার দিকে পরিবারের কেবল ওই চার সদস্য তরমুজ খান এবং এর পরেই তাদের মৃত্যু হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তরমুজ খাওয়ার কারণে মৃত্যু হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। বিষটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মেশানো হয়েছিল নাকি অন্য কোনোভাবে খাবারে মিশেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কেন এত প্রাণঘাতী জিঙ্ক ফসফাইড?
জিঙ্ক ফসফাইড মূলত পাউডার জাতীয় রাসায়নিক। এটি পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সংস্পর্শে আসামাত্রই ‘ফসফিন’ নামক একটি বর্ণহীন ও অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভরা পেটে তরমুজ জাতীয় খাবার খেলে পাকস্থলীতে অ্যাসিড নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা আরও দ্রুত ও বেশি পরিমাণে ফসফিন গ্যাস তৈরি করে। এই গ্যাস সরাসরি কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে আক্রমণ করে। ফলে ফুসফুস সচল থাকলেও শরীরের কোষগুলো অক্সিজেন গ্রহণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘সেলুলার অ্যানোক্সিয়া’ বলা হয়। এই বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর হার ৩৭ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
নেই কোনো প্রতিষেধক
চিকিৎসকদের মতে, বিশ্বে জিঙ্ক ফসফাইড বিষক্রিয়ার কোনো সরাসরি প্রতিষেধক নেই। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাঁচাতে চিকিৎসকরা কেবল এর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করতে পারেন। এক্ষেত্রে নারকেল তেল দিয়ে পাকস্থলী ওয়াশ করা হয়, কারণ তেল বিষের ওপর একটি স্তর তৈরি করে অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া ধীর করে দেয়। তবে সাধারণ পানি দিয়ে স্টোমাক ওয়াশ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এটি গ্যাস নিঃসরণ আরও ত্বরান্বিত করে মৃত্যুর পথ প্রশস্ত করতে পারে।
শনাক্ত করার উপায়
এই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির নিঃশ্বাসে রসুন বা পচা মাছের মতো এক ধরনের তীব্র গন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া এটি ভারী ধাতু হওয়ায় পেটের এক্স-রে করলে উজ্জ্বল দাগের মতো ফুটে ওঠে, যা দেখে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বিষক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। ভারতে সাধারণত রক্ত জমাট বাঁধা রোধকারী ইঁদুর মারার বিষে ব্যবহৃত হয়, যার প্রতিষেধক ভিটামিন-কে১। কিন্তু জিঙ্ক ফসফাইড কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম এবং এর কোনো প্রতিষেধক না থাকায় এটি টক্সিকোলজিস্টদের কাছে কয়েক দশক ধরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের পাইধোনির এই ঘটনা প্রমাণ করে দিলো যে, সবচেয়ে বিপজ্জনক পদার্থটি অনেক সময় বাড়ির রান্নাঘরের তাকেই লুকিয়ে থাকে।



