আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত কাজ করে এক অভিনব প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যা ক্ষতিকর জীবাণু থেকে আমাদের রক্ষা করে। তবে কখনো কখনো এই ব্যবস্থা ভুল করে বসে, আর তখনই দেখা দেয় অ্যালার্জি। সহজ ভাষায়, অ্যালার্জি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া, যা সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন কোনো পদার্থকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রমণ করে।
অ্যালার্জি কেন হয়?
অ্যালার্জির মূল কারণ হলো ইমিউন সিস্টেমের ভুল চিহ্নিতকরণ। যেমন, বৃষ্টির দিনে ভুনা খিচুরি, ইলিশ ভাজা আর বেগুন ভাজি খেতে গিয়ে শরিফ ভাইয়ের গায়ে লাল চাকা উঠে চুলকানি শুরু হলো। এখানে তাঁর শরীর বেগুনকে ক্ষতিকর মনে করে আক্রমণ চালিয়েছে, ফলে বাইরে থেকে দেখা দেয় চাকা ও চুলকানি। অথচ বেগুন অন্যদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।
অ্যালার্জির সাধারণ কারণ
- ডাস্ট মাইট: চোখে না দেখা এই পোকা মৃত চামড়ার কোষ খেয়ে বেঁচে থাকে। বিছানা, কার্পেট, সোফায় এদের বাস। এড়াতে চাদর-কাঁথা সপ্তাহে একবার গরম পানি দিয়ে ধুতে হবে এবং কার্পেট কম ব্যবহার করতে হবে।
- ছত্রাক (মোল্ড): স্যাঁতসেঁতে জায়গায় জন্মায়। বাসায় বাতাস চলাচল নিশ্চিত করে ছত্রাক দূর করতে হবে। ঘরের ভেতর কাপড় শুকানো ও গাছ রাখা এড়িয়ে চলা ভালো।
- পরাগ রেণু: ঋতু পরিবর্তনে বাতাসে পরাগের পরিমাণ বাড়ে। নির্দিষ্ট সময়ে চোখ-নাক চুলকালে, সর্দি-হাঁচি হলে পরাগ রেণু সন্দেহভাজন। সে সময় ঘরে থাকা ও বাইরে থেকে ফিরে গোসল করা জরুরি।
- গরম ও ঘাম: পরিশ্রম বা ব্যায়ামের পর শরীর গরম হলে চুলকানি হতে পারে। পাতলা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং ঠান্ডা জায়গায় থাকা উপকারী।
- ঠান্ডা: বৃষ্টিতে ভেজা বা ঠান্ডা পানিতে গোসলেও অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে।
- অন্যান্য: পশুর লোম, ধুলাবালি, পোকার কামড়, ধাতব গয়না, সাবান-শ্যাম্পুর রাসায়নিক, নির্দিষ্ট কাপড়, পেনিসিলিনের মতো ওষুধ এবং চিংড়ি, বাদাম, ডিম, দুধের মতো খাবার থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে।
অ্যালার্জি চিহ্নিতকরণ ও প্রতিরোধ
কোন জিনিসে অ্যালার্জি তা খুঁজে বের করতে একটু গোয়েন্দাগিরি করতে হবে। খাবারের ক্ষেত্রে সহজ: শরিফ ভাই বেগুন খেয়ে অ্যালার্জি দেখেছেন, তাই বেগুন এড়িয়ে চলাই সমাধান। কিন্তু ডাস্ট মাইট বা পরাগ রেণুর মতো অদৃশ্য কারণ চিহ্নিত করা কঠিন। তাই সন্দেহভাজন তালিকা তৈরি করে সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
অ্যালার্জি হয়ে গেলে কী করবেন?
অ্যালার্জির অস্বস্তি কমাতে প্রধান ওষুধ হলো অ্যান্টিহিস্টামিন। এটি হিস্টামিনের ক্রিয়া রোধ করে চুলকানি, ফোলাভাব কমায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এটি আগে থেকেও খাওয়া যায়। আরও কিছু উপায়:
- চুলকানি কমাতে আক্রান্ত স্থানে বরফের সেক দিন।
- কালামাইন লোশন, ১% মেন্থল ক্রিম বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
- নাক বন্ধ থাকলে ডিকনজেস্টেন্ট স্প্রে বা ওষুধ নিন।
- চোখ চুলকালে চোখের ড্রপ ব্যবহার করুন।
- মানসিক চাপ কমিয়ে অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখুন। যোগব্যায়াম ও শ্বাসের ব্যায়ামে মন শান্ত রাখুন।
- তীব্র অ্যালার্জিতে চিকিৎসকের পরামর্শে অল্প সময়ের জন্য স্টেরয়েড খেতে পারেন। তবে নিজে থেকে কখনোই স্টেরয়েড খাবেন না, কারণ এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।
- দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য ইমিউনোথেরাপি বা অ্যালার্জি ভ্যাক্সিন নেওয়া যেতে পারে, যেখানে অ্যালার্জেন অল্প অল্প করে ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়।
প্রাণঘাতী অ্যালার্জির লক্ষণ
কিছু অ্যালার্জি প্রাণঘাতী হতে পারে। দ্রুত নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে যান:
- শ্বাসকষ্ট, শ্বাস নেওয়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ
- বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া
- গায়ে ঘাম, কনফিউশন
- মুখ, চোখ, ঠোঁট, জিহ্বা ফুলে যাওয়া
- গায়ে চাকা, চুলকানি, বমি, পেট ব্যথা
রোগী ভালো অনুভব করলেও হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সময়মতো ইঞ্জেকশন জীবন বাঁচাতে পারে।
সবার শেষে, স্বাস্থ্য বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য www.shohay.health ওয়েবসাইট বা ‘সহায়’ অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সহজ বাংলায় তথ্য প্রকাশ করেন।



