লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বিস্ফোরণ: কারণ, ঝুঁকি ও নিরাপদ ব্যবহার
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বিস্ফোরণ: কারণ ও নিরাপত্তা

আমাদের দৈনন্দিন জীবন প্রযুক্তির ওপর যতটা নির্ভরশীল, ততটাই বিপদের আশঙ্কা আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বর্তমানে শক্তি সঞ্চয়ের এক অপরিহার্য উপাদান। স্মার্টওয়াচ, মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি—সবকিছুই এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। তবে সমস্যা শুরু হয় যখন ছোট ডিভাইসের অভিজ্ঞতা থেকে উৎসাহিত হয়ে গাইডলাইন ছাড়াই বড় ইনভার্টার বা আইপিএস-ইউপিএসের ব্যাটারি তৈরি করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথাযথ প্রকৌশল জ্ঞান, মান নিয়ন্ত্রণ ও সার্কিট থিওরির সঠিক প্রয়োগ ছাড়াই তৈরি করা হয় এসব ব্যাটারি প্যাক। এগুলো আসলে উচ্চ-শক্তির রাসায়নিক ভান্ডার, যা ভুলভাবে অ্যাসেম্বল করলে কিংবা সঠিকভাবে ব্যবহার না জানলে বিধ্বংসী বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

থার্মাল রানঅ্যাওয়ে: দুর্ঘটনার ময়নাতদন্ত

একটি সাধারণ পাওয়ার ইনভার্টার বা আইপিএস হঠাৎ বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়। কেন হয়, তা বুঝতে লিথিয়াম সেলের ভেতরের রসায়ন ও বিকল প্রক্রিয়া বোঝা জরুরি। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে অ্যানোড, ক্যাথোড, একটি সেপারেটর ও অত্যন্ত উদ্বায়ী ও দাহ্য ঘন-তরল ইলেকট্রোলাইট থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় লিথিয়াম আয়নগুলো অ্যানোড ও ক্যাথোডের মধ্যে সুশৃঙ্খলভাবে যাতায়াত করে। কিন্তু এই শৃঙ্খলায় ব্যত্যয় ঘটলেই ভয়াবহ ত্রুটি বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

থার্মাল রানঅ্যাওয়ে লিথিয়াম ব্যাটারির জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এটি ব্যাটারির ভেতরে একটি অনিয়ন্ত্রিত তাপ বৃদ্ধির চেইন রিঅ্যাকশন, যা একবার শুরু হলে থামানো কঠিন। তিনটি প্রধান কারণে এটি ঘটে—ব্যাটারিতে আঘাত, বাইরের অতিরিক্ত তাপ ও ওভারচার্জ। বর্তমানে বেশিরভাগ সোলারভিত্তিক বা রেগুলার ইনভার্টারে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। একটি সেল নির্ধারিত ভোল্টেজের চেয়ে বেশি চার্জ হলে এর ক্যাথোড কাঠামো ভেঙে গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে। এই মুক্ত অক্সিজেন ও দাহ্য তরল মিশ্রণে সামান্য স্পার্ক লাগলেই আগুন ধরে যায়। যখন একটি সেলের তাপমাত্রা ১৫০°C থেকে ২০০°C ছাড়িয়ে যায়, তখন ভয়াবহ তাপ-বর্জনকারী রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এই বিক্রিয়া যত তাপ উৎপন্ন করে, তাপমাত্রা তত বাড়তে থাকে এবং চাপ এত বেশি হয় যে সিল করা সেলটি তা সইতে পারে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্যাসকেড ইফেক্ট বা ডোমিনো প্রভাব

ইউপিএস ব্যাটারি প্যাকগুলোতে সেলগুলো খুব ঠাসাঠাসি করে রাখা থাকে। ফলে একটি সেল থার্মাল রানঅ্যাওয়েতে আক্রান্ত হলে তার প্রচণ্ড তাপ মুহূর্তেই পাশের সেলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে একটি সেল থেকে পুরো ব্যাটারি প্যাকে আগুন ধরে যায় এবং এটি একটি ভয়াবহ আগুনের গোলায় রূপ নেয়।

স্বল্পজ্ঞানে তৈরি অনিয়ন্ত্রিত সেটআপের লুকানো বিপদ

সস্তায় পাওয়ার ব্যাকআপ পেতে অনেকে ইউটিউব দেখে বা স্থানীয় দোকান থেকে সস্তা পার্টস কিনে নিজেরা ব্যাটারি প্যাক তৈরি করছেন। এসব অনিয়ন্ত্রিত সেটআপে গুণগত মান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা থাকে না এবং প্রায়ই অত্যন্ত জরুরি নিরাপত্তা ফিচার বাদ দেওয়া হয়।

লিথিয়াম-আয়ন প্যাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিএমএস (ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম)। বিএমএসকে ব্যাটারি প্যাকের মগজের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর কাজ হলো প্রতিটি সেলের ভোল্টেজ, কারেন্ট ও তাপমাত্রা প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করা। কোনো কারণে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বা ভোল্টেজ অনিয়ন্ত্রিত হলে বিএমএস সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ কেটে ব্যাটারিকে রক্ষা করে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত সেটআপে খরচ কমাতে গিয়ে অনেক সময় বিএমএস লাগানো হয় না বা নিম্নমানের বোর্ড ব্যবহার করা হয়। ফলে ব্যাটারি বিপদের দিকে এগোলে থামানোর কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থাকে না।

ব্যাটারি প্যাকের প্রতিটি সেল ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে পারফরম্যান্সের কিছুটা ক্ষয় হয়। ভালো মানের সিস্টেমে সব সেলের ভোল্টেজ সমান রাখার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত সিস্টেমে কোনো সেল বেশি চার্জ হয়, আবার কোনোটি একদমই হয় না বা কম হয়। দীর্ঘ সময় এভাবে চলতে থাকলে ব্যাটারির ভেতরে অতিক্ষুদ্র কপারের ডেনড্রাইট (তড়িৎ-বিশ্লেষ্য ধাতব কণা) তৈরি হয়, যা সেপারেটর ফুটো করে সরাসরি ইন্টারনাল শর্ট-সার্কিট ঘটায়।

শক্তিশালী ব্যাটারি প্যাক তৈরি করতে স্পট-ওয়েল্ডিং ও উন্নত মানের নিকেল স্ট্রিপ প্রয়োজন। কিন্তু দেশে অনেকেই সাধারণ সোল্ডারিং আয়রন দিয়ে ব্যাটারির মাথায় সোল্ডারিং লিড গলাতে যান। সোল্ডারিং আয়রনের তীব্র তাপ সরাসরি ব্যাটারির ভেতরের রাসায়নিক কাঠামো ও সিল নষ্ট করে দেয়, যা ভবিষ্যতে যেকোনো সময় লিকেজ বা আগুনের কারণ হতে পারে। আবার স্পট-ওয়েল্ডিং সঠিকভাবে না ব্যবহার করলেও ব্যাটারি সেলের ক্ষতি হতে পারে।

কেন এটি বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়

অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি সেটআপকে বোমার সঙ্গে তুলনা করা অতিরিক্ত নয়। দেশে অনেকে ব্যাটারিসহ পাওয়ার ইনভার্টার তৈরি করেন এবং নিম্নমানের পাওয়ার স্টেশন আমদানি করছেন। বদ্ধ চেম্বারে ইনভার্টার রাখার কারণে পুরো সিস্টেম অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন করে থার্মাল রানঅ্যাওয়ে শুরু হয়। ফলাফল ভয়ংকর। ব্যাটারির ভেতরের কেমিক্যাল ভেঙে হাইড্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড ও মিথেনের মতো দাহ্য গ্যাস তৈরি হয়।

গ্যাস বাড়তে বাড়তে ব্যাটারির ভেতরের চাপ সীমা ছাড়ালে কেসিং ফেটে যায় এবং গ্যাস প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে আসে। সেই গ্যাস আগুনের ফুলকির সংস্পর্শে এলে মুহূর্তের মধ্যে কয়েক ফুট লম্বা টর্চ বা জেটের মতো আগুনের শিখা তৈরি হয়। এই আগুন ঘরের আসবাবপত্র বা দেয়ালে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে বাঁচার সময়টুকুও পাওয়া যায় না। অনিয়ন্ত্রিত সেল একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলে শক্তির প্রভাবে ইনভার্টারের বডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি: পোড়া ক্ষত ও বিষাক্ত ধোঁয়া

ব্যাটারি বিস্ফোরণে কেবল অগ্নিকাণ্ডই ঘটে না, এটি মানুষের শরীরের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। ব্যাটারি ফেটে গেলে ভেতরের তড়িৎ-বিশ্লেষ্য তরল চামড়ায় পড়লে মারাত্মক কেমিক্যাল বার্ন বা ক্ষত তৈরি হয়। পুড়ে যাওয়া ব্যাটারি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় হাইড্রোজেন ফ্লোরাইড গ্যাস থাকে। এই গ্যাস ফুসফুসে প্রবেশ করলে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে এবং রক্তে মিশে শরীরের ভেতরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে।

নিরাপদ সেটআপের নির্দেশিকা

লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির সুবিধা নিতে প্রকৌশলগত নিয়ম মেনে চলা জরুরি। কখনোই সস্তা বা সেকেন্ডহ্যান্ড ব্যাটারি দিয়ে ইনভার্টার বানাবেন না। সব সময় CE বা UL সার্টিফায়েড ব্যাটারি ব্যবহার করুন। নিশ্চিত করুন আপনার সিস্টেমে উচ্চ মানের বিএমএস আছে, যা তাপমাত্রা ও ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। সস্তা সার্কিট বোর্ডের ওপর ভরসা করবেন না। সব সময় ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় ব্যাটারি রাখুন। গরম ঘর বা আবদ্ধ স্থানে ইনভার্টার রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

যদি ব্যাটারি প্যাক ফুলে গেছে বা অতিরিক্ত গরম হচ্ছে, তবে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করে দিন। ব্যাটারির সঙ্গে লাগানো দুটি তারের যেকোনো একটি খুলে ফেলুন। ফুলে যাওয়া মানে ভেতরে গ্যাস জমছে, যা বিস্ফোরণের পূর্বলক্ষণ। এ ছাড়া ব্যাটারি কেসিং অতিরিক্ত গরমে বেঁকেও যেতে পারে, যা আরও ভয়াবহ ব্যাপার।

শেষ কথা

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এর নিরাপত্তার বিষয়গুলো অবমূল্যায়ন করা ঠিক নয়। একটি অনিয়ন্ত্রিত ও সস্তা ব্যাটারি সেটআপ আপনার ঘর বা অফিসের মাঝখানে একটি জীবন্ত বোমা বসিয়ে রাখার সমান। প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে নিজের ও পরিবারের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন না। সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রকৌশল পদ্ধতি মেনে চলাই এসব প্রযুক্তি নিরাপদে ব্যবহারের একমাত্র উপায়।

লেখক: চিফ ইনস্ট্রাক্টর, বিটিটিআই

সূত্র: ব্রিটিশ সেফটি কাউন্সিল, এনএফপিএ এবং ইউএস ফায়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন