হাম একটি অতি সংক্রামক ব্যাধি, যার জন্য দায়ী একটি ভাইরাস। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা রয়েছে এবং বাংলাদেশে বহুদিন থেকেই শিশুদের এই টিকা দেওয়া হয়। একসময় হামের জন্য একটি টিকাই দেওয়া হতো, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাম্পস ও রুবেলা। এই টিকা ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে শিশুদের দেওয়া হয়, যাতে তারা আজীবন হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে। নবজাতককে হামের টিকা দিতে হয় না, কারণ দেশে হাম প্রতিরোধী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টিকা রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে। এছাড়া মায়ের দুধের মাধ্যমে শিশুরা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা পায়, তাই ৯ মাস পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় শূন্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি ও হামের টিকাদান কর্মসূচি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সরকারি পরিকল্পনা এইচপিএনএসপি (স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা বিষয়ক সেক্টর প্ল্যান) বাতিল করা হয়। এর পেছনে অব্যবস্থাপনা ও আওয়ামী লীগ সরকারসহ অন্যান্য সরকারের সময় দুর্নীতির কথা বলা হলেও কোনো দালিলিক প্রমাণ ছিল না। হাম নির্মূলের লক্ষ্যে বাংলাদেশে সরকারিভাবে কিছুদিন পরপর হামের টিকার ক্যাম্পেইন এবং পুষ্টি ও ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণের ক্যাম্পেইন পরিচালিত হতো। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালে, এবং সিদ্ধান্ত ছিল প্রতি চার বছর পরপর এই ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হবে।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক ডামাডোলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হামের টিকার ক্যাম্পেইন ঝুলে যায়। শুধু তাই নয়, এইচপিএনএসপির চতুর্থ সেক্টর প্ল্যান শেষ হয়ে যায় এবং পঞ্চম প্ল্যান অনুমোদনের আগেই সরকারের পতন ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের বাজেটে এই বিষয়ে অর্থ বরাদ্দ রেখেছিল, কারণ দাতা সংস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ ছিল।
টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ ও স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয়
২০২৪ সালের আগস্টের পর এইচপিএনএসপি নবায়নে দেরি হয় এবং হামের টিকার ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়নি। ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার পঞ্চম পরিকল্পনার অর্থ বরাদ্দ ও পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়। এতে অর্থাভাবে পুরো সেক্টর প্ল্যান বন্ধ হয়ে যায় এবং এর অধীনে ৩৮টি কার্যক্রমের প্রায় সবগুলোই বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হয়। শুধু হাম নয়, জলাতঙ্ক, যক্ষ্মা, সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম, এইডসের ওষুধ বিতরণ, ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। স্বাস্থ্যকর্মীরা বেতনের দাবিতে রাস্তায় নামলে অন্তর্বর্তী সরকার তাদেরই দায়ী করে।
মূল সমস্যা হলো, অন্তর্বর্তী সরকার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা করে, যা সঠিক ছিল না। ইউনিসেফসহ দাতা সংস্থাগুলোর বারবার তাগিদ সত্ত্বেও এই পদ্ধতি অব্যাহত রাখায় টিকাদান ব্যাহত হয়। ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু টিকা না পেয়েই থেকে যায় এবং হাম প্রতিরোধী না হয়েই বড় হতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়ায় হার্ড ইমিউনিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
সুশীল সমাজের নীরবতা
মানুষ আশা করেছিল, সুশীল সমাজ অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করবে, যেমনটি অতীতে রাজনৈতিক সরকারের বেলায় করেছিল। কিন্তু সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ হামের মৃত্যুর ব্যাপারে নীরব থেকেছে এবং নিজেরা নিরাপদ অবস্থান থেকে চোখ ফিরিয়ে রেখেছে। ড. ইউনূস স্বাস্থ্য খাতে অভিজ্ঞতাহীন একজন নারীকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন, যিনি নিজেও একটি গুরুতর ব্যাধিতে আক্রান্ত। তিনি একাধিকবার বিদেশে নিজের চিকিৎসা নেন এবং দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন। মাইলস্টোন কলেজের দুর্ঘটনার পরও তাকে কোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে যেতে দেখা যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টরা সাধারণত ঘটনাস্থলে ছুটে যেতেন, কিন্তু হামে প্রাণ হারানো পাঁচশো শিশুর কোনো পরিবারের কাছে কোনো উপদেষ্টা যাননি। সুশীল সমাজের অংশ হয়েও তারা সরকারের ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করে অতীত সরকারের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন। হামের ইস্যুতে সুশীল সমাজের নীরবতা তাদের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
স্বাস্থ্য খাতে পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্য
ড. ইউনূস একটি পক্ষপাতদুষ্ট স্বাস্থ্য কমিশন করেন এবং পক্ষপাতদুষ্ট স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ব্যক্তিগত কোটায় কর্মচারী নিযুক্ত করেন, যা পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। জুলাইয়ের মূল কথা ছিল বৈষম্যের সমাজ দূর করে মেধার পরিচর্যা, কিন্তু আমরা দেখলাম নির্লজ্জ দলীয়করণ। দায়িত্ব নেওয়ার সময় তারা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ ও নিরপেক্ষ আচরণের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে ঘুষের বিনিময়ে পোস্টিং, ট্রান্সফার ও পদোন্নতির বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
পাঁচশো শিশুর মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি। তারা তদন্ত বা ক্ষতিপূরণের দাবিও তোলেনি। যারা অতীতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভারতীয় কর্মচারী আবিষ্কার, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব থাকতেন, তারা এই মৃত্যুর বিষয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হননি।
স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যৎ বিপর্যয়
সমস্যা শুধু হাম নয়, সামনে স্বাস্থ্য খাতের আরও বিপর্যয় দেখা যাবে। স্বাস্থ্য বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, এবং এই অধিকার অর্জনে জনগণের সচেতনতা একমাত্র বিষয় নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে যারা জানেন, গবেষণা করেন বা সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের সবাইকে নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ঢেলে সাজানো দরকার। কিন্তু এই দাবিও সুশীল সমাজ করছেন না; তারা ব্যস্ত নিজেদের সনদ, ঘোষণা ও সংস্কার প্রচারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতা মানুষ বুঝতে পারে। চুপ করে থেকে লাভ নেই, বরং পর্যালোচনার মাধ্যমে বোঝা যাবে কেন আমরা স্বপ্নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছি না। কেন আন্দোলনে এত প্রাণের ক্ষয়ের পরও শিশুদের অসহায়ভাবে প্রাণ দিতে হচ্ছে? কেন বৈষম্য দূর করার নামে নতুন বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, যা জীবনের অধিকার ও স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য? এই বৈষম্য একটি প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
হামের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও প্রজন্মের ক্ষতি
হাম সেরে গেলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত অসুস্থতা থেকে যেতে পারে এবং হামের কারণে পুষ্টিহীনতা তৈরি হয়, যা শিশুর বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে। পঞ্চাশ হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু সুশীলদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এটি দুঃখজনক। স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনাম ছিল টিকা ও মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যের সফলতার কারণে। এই সফলতা প্রায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, এবং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বিপদের মুখে দাঁড় করিয়ে বাংলাদেশের পুরনো দরিদ্র চেহারা তুলে ধরা হয়েছে।
তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়া দেশকে থামিয়ে দেওয়ার কাজ করেছে ড. ইউনূসের সরকার। তারা একের পর এক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নতুন সরকারের ওপর। যে শিশুরা মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের তিয়াত্তর বছর আয়ু পাওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন তিয়াত্তর বছর। এই শিশুদের পিতা-মাতা তাদের বার্ধক্যে যত্ন নেওয়ার আশা করেছিলেন। এই পরিবারগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পর হাম কেন ছড়ালো, তার কোনো ব্যাখ্যা বা জবাবদিহি কেউ দেবে না বলে আশা করা যায়।
তদন্তের দাবি
এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত— কেন ও কীভাবে বাংলাদেশে হাম ছড়িয়ে পড়ল, কেন ও কীভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চলমান প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এটি জানার অধিকার বাংলাদেশের মানুষের আছে। তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলে কিছুটা হলেও মৃত শিশুদের পিতা-মাতা শান্তি পাবেন।



