ক্যানসার প্রতিরোধে করণীয়: জীবনযাপনে পরিবর্তন ও নতুন চিকিৎসার আশার আলো
গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় ধনী দেশগুলোতে ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি হলেও, রাসায়নিক পদার্থ, পরিবেশ দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার কারণে এখন সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এই রোগের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তবে পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলেই যে আপনারও ক্যানসার হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং ক্যানসার থেকে মুক্তি পাওয়ার মূল চাবিকাঠি অনেকটাই আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস ও সচেতনতার ওপর নির্ভরশীল।
দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আনুন
টানা বসে না থাকা: জার্মানির রেজেন্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, একটানা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে ক্যানসারের ঝুঁকি প্রতি দুই ঘণ্টায় প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। তাই প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর উঠে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
রান্নার পদ্ধতি পরিবর্তন: কয়লার আগুনে পোড়ানো বা উচ্চ তাপমাত্রায় ভাজা মাংসে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়। মাংস রান্নার আগে মেরিনেট করে নিলে এই ক্ষতিকর কেমিক্যাল উৎপন্ন হওয়া অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।
মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ব্যবহার সীমিত করুন: একটি স্প্যানিশ গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে, মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ব্রকলি দিলে এর ক্যানসার প্রতিরোধক্ষমতা প্রায় ৯৭ শতাংশ কমে যায়! স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার জন্য ওভেনে বেক করার পরিবর্তে সেদ্ধ করে খাওয়া উচিত।
লবণ গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ: প্রতিদিন ৬ গ্রামের কম লবণ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য আদর্শ। অতিরিক্ত লবণ পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে, তাই সচেতনতা জরুরি।
তাজা ফলমূল সংরক্ষণ: ফলমূল ফ্রিজের বদলে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখলে এর পুষ্টিগুণ অটুট থাকে। উদাহরণস্বরূপ, টমেটো ফ্রিজে না রেখে বাইরে রাখলে এতে দ্বিগুণ পরিমাণ বিটা-ক্যারোটিন এবং ২০ গুণ বেশি লাইকোপেন স্থায়ী থাকে, যা ক্যানসার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকরী।
ক্যানসার ধরা পড়লে কী করবেন?
ক্যানসার ধরা পড়লে ভেঙে পড়বেন না। ক্যানসারের বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা ক্লিনিক খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। রোগ ও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করুন। অনেক ক্যানসারই সফলভাবে নিরাময় করা সম্ভব, যদি তা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়।
শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক পরিচর্যাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আশাহত হওয়া আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটান, পুষ্টিকর খাবার খান এবং নিজেকে চিন্তামুক্ত রাখার চেষ্টা করুন।
ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন আশার আলো
সম্প্রতি ক্যানসার নির্মূলে যুগান্তকারী এক আবিষ্কারের খবর এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা ডস্টারলিমাব (ব্র্যান্ড নাম জেমপারলি) নামে একটি ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করেন। ১৮ জন মলাশয় ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর ওপর টানা ছয় মাস এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।
নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের এই ট্রায়ালের ফলাফল চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের রীতিমতো চমকে দিয়েছে! ছয় মাস পর দেখা যায়, ১৮ জন রোগীর প্রত্যেকের শরীর থেকে টিউমারটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে! রোগীদের এন্ডোস্কোপি, এমআরআই বা পিইটি স্ক্যান করেও ক্যানসারের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।
গবেষকেরা এই ওষুধকে মিরাকল ড্রাগ বলে উল্লেখ করেছেন। ডস্টারলিমাব মূলত ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত একটি ড্রাগ, যা মানবদেহে বিকল্প অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সাহায্য করে। ২০১৯ সালে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের বায়োটেক কোম্পানি টেসারো ওষুধটি তৈরি করে। ২০২১ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র চিকিৎসাক্ষেত্রে এই ওষুধের ব্যবহারের অনুমোদন দেয়।
ক্যানসার নির্মূলের জন্য রোগীদের সাধারণত কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন বা অস্ত্রোপচারের মতো কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার ফলে চুল পড়া থেকে শুরু করে অন্ত্রজনিত সমস্যা ও শারীরিক নানা অক্ষমতা দেখা দেয়। কিন্তু ডস্টারলিমাব প্রয়োগের ফলে রোগীদের সে রকম কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
বিজ্ঞানীরা বর্তমানে কেমোথেরাপির বিকল্প হিসেবে নানা ধরনের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার করে সাধারণ কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই ক্যানসার আক্রান্ত কোষকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ক্যানসারের বিস্তৃতি, দূষিত পরিবেশ ও আমাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে একে জয় করা কঠিন হলেও বিজ্ঞানীরা থেমে নেই। তাঁরা নিরলসভাবে চেষ্টা করে চলেছেন, কীভাবে মানুষকে এই ক্যানসারের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা যায়।
লেখক: চিকিৎসক ও বিজ্ঞান লেখক, মাগুরা সদর হাসপাতাল, মাগুরা।
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান, ডেভিডসনস ক্লিনিক্যাল মেডিসিন, জার্নালস অব আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি, সিদ্ধার্থ মুখার্জি/দ্য এম্পারর অব অল ম্যালাডিজ।



