দেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ শিশু মারা যাওয়ায় সারাদেশে মোট মৃত্যু ৫১২-এ পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) সর্বশেষ বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত ২১৩২
বুলেটিন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত শিশুদের মধ্যে একজনের হাম সংক্রমণ ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। বাকি ১২ জন হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। একই সময়ে নতুন করে ২,১৩২ শিশু আক্রান্ত হয়েছে।
সরকারি তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ৮৬ শিশু নিশ্চিত হামে এবং আরও ৪২৬ শিশু হাম-সদৃশ উপসর্গে মারা গেছে। গত দুই মাসে মোট ৮,৪৯৪টি নিশ্চিত হামের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে ৬২,৫৬০ শিশু হাম বা হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে হামের ঘটনা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে।
গত ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ
গত ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৫ সালে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ হামের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, যার সংখ্যা ছিল ২৫ হাজারের বেশি। এরপর একটি জাতীয় গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়, যার ফলে ধীরে ধীরে সংক্রমণ কমতে থাকে।
২০০৬ সালে ৬ হাজারের বেশি ঘটনা রিপোর্ট করা হয়। ২০০৭ সালে তা কমে ২,৯০০ এবং ২০০৮ সালে ২,৬০০-এ দাঁড়ায়। ২০০৯ ও ২০১০ সালে ঘটনা আরও কমে ৭০০-এর ঘরে নেমে আসে।
২০১১ সালে আবার ৫ হাজারের বেশি ঘটনা শনাক্ত হয়, এরপর ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ক্রমাগত হ্রাস পায়। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ঘটনা আবার বাড়তে থাকে, যা বার্ষিক ২,০০০ থেকে ৫,০০০-এর মধ্যে ওঠানামা করে।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সংক্রমণ তীব্রভাবে কমে বার্ষিক ১০০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
২০২৬ সালে দেশটি গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাবের সম্মুখীন হচ্ছে। এ পর্যন্ত ১০,১৯৮টি নিশ্চিত হামের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, আর সন্দেহভাজন ঘটনা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে।
মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান
১০ মে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০০ ছাড়ায়, ২৪ ঘণ্টায় ১১ জন মারা যায়। তখন সন্দেহভাজন ঘটনা ছিল ৪৯,১৫৯ এবং নিশ্চিত ঘটনা ৬,৮১৯।
৪ মে মৃত্যু ৩০০ ছাড়ায়, ২৪ ঘণ্টায় ১৭ জন মারা যায়। ১৫ মার্চ থেকে ৪ মে পর্যন্ত সন্দেহভাজন ঘটনা ছিল ৪১,৭৯৩ এবং নিশ্চিত ঘটনা ৫,৪৬৭।
১৬ এপ্রিল মৃত্যু ২০০ ছাড়ায়, ২৪ ঘণ্টায় ৮ জন মারা যায়। ১৫ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহভাজন ঘটনা ছিল ২০,৩৫২ এবং নিশ্চিত ঘটনা ৩,০৬৫।
৭ এপ্রিল মৃত্যু ১০০ ছাড়ায়, ২৪ ঘণ্টায় ২১ জন মারা যায়। ১৫ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহভাজন ঘটনা ছিল ৯,৮৮৩ এবং নিশ্চিত ঘটনা ১,৩৯৮।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি প্রভাব
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলমান প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগ। এখানে সর্বোচ্চ সংখ্যক সংক্রমণ ও মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এ পর্যন্ত বিভাগটিতে ২১৪ শিশুর মৃত্যু এবং ৩৫,৫১৩টি সংক্রমণ হয়েছে।
১৫ মার্চ থেকে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে। সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যু ১৬৪টি এবং নিশ্চিত মৃত্যু ৫০টি, মোট ২১৪টি।
রাজশাহী বিভাগে ৭৯টি সন্দেহভাজন ও ২টি নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ৪২টি সন্দেহভাজন ও ১০টি নিশ্চিত মৃত্যু। বরিশালে ৩১টি সন্দেহভাজন ও ১৯টি নিশ্চিত মৃত্যু। সিলেটে ৪৯টি সন্দেহভাজন ও ৩টি নিশ্চিত মৃত্যু। ময়মনসিংহে ৩৫টি সন্দেহভাজন ও ২টি নিশ্চিত মৃত্যু। খুলনা বিভাগে ২১টি সন্দেহভাজন মৃত্যু এবং রংপুর বিভাগে ৫টি সন্দেহভাজন মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান
২০২৬ সালের এই প্রাদুর্ভাব, যাতে হামজনিত মৃত্যু ৫০০ ছাড়িয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশ্বব্যাপী অন্যতম বৃহৎ বলে বিবেচিত হচ্ছে। একাধিক দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর হামজনিত মৃত্যুতে শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সুদানে ৩৭১ জন এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানে কমপক্ষে ৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, টিকাদানের হার হ্রাসের কারণে একাধিক অঞ্চলে নতুন করে প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রাদুর্ভাব সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হয়ে উঠেছে।
ডব্লিউএইচওর তথ্যে আরও দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালে ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ক্যামেরুনেও নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।



