এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬: পদার্থবিজ্ঞানে বেশি নম্বর পেতে করণীয়
এইচএসসি ২০২৬: পদার্থবিজ্ঞানে বেশি নম্বর পেতে করণীয়

প্রিয় পরীক্ষার্থীবৃন্দ, তোমাদের শিক্ষাজীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহাসন্ধিক্ষণ হচ্ছে এই এইচএসসি পরীক্ষা। এই পরীক্ষার ফলাফল তোমাদের ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা এবং পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে যারা ভবিষ্যতে প্রকৌশল, চিকিৎসা বিজ্ঞান কিংবা বিশুদ্ধ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করার স্বপ্ন দেখছ, তাদের জন্য পদার্থবিজ্ঞান বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পদার্থবিজ্ঞানের প্রস্তুতি: সম্পূর্ণ সিলেবাসে গুরুত্ব

দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শ্রেণীকক্ষে পদার্থবিজ্ঞান পড়ানোর সুবাদে এবং দীর্ঘকাল এইচএসসি পরীক্ষার প্রধান পরীক্ষক হিসেবে খাতা মূল্যায়নের অভিজ্ঞতার আলোকে, পরীক্ষার ঠিক পূর্ব মুহূর্তের এই সময়ে তোমরা কীভাবে পদার্থবিজ্ঞানের প্রস্তুতি নেবে এবং পরীক্ষার খাতায় কীভাবে উত্তর উপস্থাপন করবে, সেই বিষয়ে কিছু জরুরি দিক মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই আমার এই লেখা।

পদার্থবিজ্ঞান বিষয়টি দুটি পত্রে বিভক্ত এবং ভালো ফলাফলের জন্য উভয় পত্রেই সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। বিগত বছরগুলোর করোনা পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সিলেবাস থেকে বেরিয়ে এসে এবার সম্পূর্ণ সিলেবাসের ওপর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাই কোনো অধ্যায় পুরোপুরি বাদ দিয়ে বা বেছে বেছে শুধু নির্দিষ্ট কিছু সাজেশনের ওপর নির্ভর করে পরীক্ষা দিতে যাওয়া একেবারেই ঠিক হবে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এছাড়া পরীক্ষা কিছুটা দেরিতে শুরু হওয়ার কারণে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় তোমরা তুলনামূলক কম পাবে। যে সময়টুকু আছে তার যথাযথ ব্যবহার করে মূল বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের ধারণা পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মানবন্টন ও সৃজনশীল প্রশ্নের কাঠামো

পদার্থবিজ্ঞানের মানবন্টন লক্ষ্য করলে দেখা যায় সৃজনশীল অংশে পঞ্চাশ, বহুনির্বাচনি অংশে পঁচিশ এবং ব্যবহারিক অংশে পঁচিশ নম্বরের বরাদ্দ রয়েছে। ভালো ফলাফলের জন্য প্রতিটি অংশই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আটটি সৃজনশীল প্রশ্নের মধ্য থেকে তোমাদের পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর করতে হবে।

অনেকে মনে করে যে কোনো পাঁচটি অধ্যায় খুব ভালো করে পড়লেই পরীক্ষায় ভালো করা সম্ভব, যা একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন অধ্যায়ের সূত্র ও ধারণা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই একটি উদ্দীপকের বিভিন্ন অংশের প্রশ্ন একাধিক অধ্যায় থেকে চলে আসতে পারে।

জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনমূলক অংশের গুরুত্ব

সৃজনশীল প্রশ্নের চারটি অংশ থাকে যা হলো জ্ঞানমূলক (ক), অনুধাবনমূলক (খ), প্রয়োগ (গ) এবং উচ্চতর দক্ষতা (ঘ)। দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমি একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। যা শিক্ষার্থীদের ভালো নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক শিক্ষার্থীই গাণিতিক বা প্রয়োগমূলক অংশে ভালো করলেও জ্ঞানমূলক (ক) এবং অনুধাবনমূলক (খ) প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়।

মনে রাখবে, একটি সৃজনশীল প্রশ্নের শুরুতেই যখন একজন পরীক্ষক দেখেন যে শিক্ষার্থীর জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনমূলক উত্তরটি সঠিক বা সন্তোষজনক হয়নি, তখন শিক্ষার্থীর মেধা ও গভীরতা সম্পর্কে পরীক্ষকের মনে একটি নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়। প্রথম দুটি অংশের এই দুর্বলতা পুরো প্রশ্নের বাকি উত্তরগুলোর ওপরও একটি বাজে প্রভাব ফেলে। যার ফলে পরবর্তী অংশগুলোতে ভালো লিখলেও কাঙ্ক্ষিত নম্বর থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই মূল বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা, নীতি ও ব্যাখ্যাগুলো খুব নিখুঁতভাবে মুখস্থ ও অনুধাবন করতে হবে, যাতে প্রশ্নের শুরুতেই পরীক্ষকের ওপর একটি চমৎকার ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা যায়।

পরীক্ষার আগের দিনগুলোর প্রস্তুতি

পরীক্ষার আগের এই দিনগুলোতে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় পদার্থবিজ্ঞানের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত। তোমরা টেস্ট পেপার থেকে বিভিন্ন বোর্ডের সৃজনশীল প্রশ্নগুলো দেখে সময় ধরে খাতায় লেখার অভ্যাস করবে। পদার্থবিজ্ঞানের মূল শক্তি হলো এর গাণিতিক সমস্যা এবং সূত্রের সঠিক প্রয়োগ। খাতায় গাণিতিক সমস্যার সমাধান করার সময় পাশে ব্যবহৃত ধ্রুবক ও তথ্যের মান সুনির্দিষ্ট এককসহ উল্লেখ করবে।

অনেক শিক্ষার্থী তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে এককের জায়গায় ভুল করে বসে, যা পুরো উত্তরের মান কমিয়ে দেয়। পরীক্ষার ঠিক পূর্বে প্রতিটি পত্র রিভিশন দেওয়ার সময় প্রথমে বহুনির্বাচনি অংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা, সূত্র এবং ছোট ছোট গাণিতিক অনুসিদ্ধান্তগুলো চোখ বুলিয়ে নেওয়া ভালো। এতে পুরো অধ্যায়ের ওপর একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়ে যায়।

চিত্র অঙ্কন ও উত্তর উপস্থাপন

পরীক্ষার খাতায় চিত্র অঙ্কন করা পদার্থবিজ্ঞানের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা তোমাদের আগে থেকেই অনুশীলন করতে হবে। যেখানেই প্রয়োজন, বিশেষ করে জ্যামিতিক আলোকবিজ্ঞান বা তড়িৎ বিজ্ঞানের মতো অধ্যায়গুলোতে স্পষ্ট সার্কিট বা রশ্মিচিত্র অঙ্কন করবে এবং অবশ্যই পেন্সিল ব্যবহার করে চিহ্নিত করবে। পরীক্ষার সময় যে প্রশ্নটির উত্তর লেখা শুরু করবে, তার চারটি অংশই পর পর শেষ করার চেষ্টা করবে।

বিজ্ঞানের উত্তর হতে হবে সংক্ষিপ্ত এবং সুনির্দিষ্ট। অপ্রয়োজনীয় কথা লিখে খাতার পাতা ভরানোর কোনো সুযোগ এখানে নেই। অতিরিক্ত লিখলে কোনো বাড়তি নম্বর পাওয়া যায় না। বরং এতে শুধু সময়ের অপচয় হয় যা পরবর্তী প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করে।

ব্যবহারিক পরীক্ষার প্রস্তুতি

ব্যবহারিক খাতাটি পরীক্ষার পূর্বেই সুন্দর ও পরিচ্ছন্নভাবে প্রস্তুত করে রাখবে এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ভাইভার জন্য মূল সূত্র ও যন্ত্রপাতির কার্যপ্রণালি ভালো করে দেখে যাবে।

তোমাদের সবার কঠোর পরিশ্রম ও মেধার সঠিক প্রতিফলনে পরীক্ষা অনেক সুন্দর ও সফল হোক, এই শুভকামনা রইল।

সুদেব চন্দ্র পাল
সহকারী অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, সেন্ট জোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ