বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে: কারণ ও বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে

বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজিএমই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন প্রায় ১ হাজার ৭৪৭ জন। ২০২১-২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১২ জনে এবং ২০২২-২৩ সালে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৬ জনে। কিন্তু ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে সংখ্যা কমতে শুরু করে; ওই বছর ভর্তি হন ১ হাজার ৬৬৯ জন, এবং ২০২৪-২৫ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৮৭ জনে।

কেন কমছে বিদেশি শিক্ষার্থী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং ২০২৪ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা—এগুলোই প্রধান কারণ। তবে এর বাইরেও নেপাল ও মালদ্বীপে চিকিৎসাবিদ্যা পড়ার সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা সেদিকে ঝুঁকছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এজেন্সি রাশিয়া, চীনসহ অন্যান্য দেশে পড়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।

সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেলের চিত্র

সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে সার্ক ও নন-সার্ক কোটায় বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে সার্ক কোটায় ১২৫টি এবং নন-সার্ক কোটায় ৯৯টি আসন বরাদ্দ ছিল। তবে সব আসন পূর্ণ হয় না। অধ্যাপক ডা. ফারুক আহাম্মদ, স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন), বলেন, ‘আমরা সব সময় বিদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে আন্তরিক। তাদের কথা শুনে থাকা, খাওয়া ও স্যানিটেশনের কিছু সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি আরও বেশি কমেছে। ডিজিএমইর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসাশিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমীন বলেন, ‘গতবার মোটামুটি স্টুডেন্ট ছিল। এবার বিদেশি শিক্ষার্থী পেয়েছি গতবারের চেয়ে কম। বেসরকারি মেডিকেলগুলো আগের মতো বিদেশি শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে, আমরাও সহায়তা করছি।’

ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা

ভারতের মণিপুর থেকে আসা হানজাবাম ধনরাজ শর্মা বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজে শেষ বর্ষে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ওখানে সরকারি মেডিকেলে চান্স পাওয়া খুব কঠিন। বেসরকারি মেডিকেলের খরচ এখানকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম আমাদের সঙ্গে মেলে, দূরত্ব কম, ভাষা সহজ।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিউজ ও সোশ্যাল মিডিয়া দেখে আত্মীয়স্বজন দুশ্চিন্তায় পড়েন, কিন্তু আমি সব সময় নিরাপদ বোধ করেছি।’

নেপালের ডা. রাম সাগর শাহ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিওনেটোলজিতে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে চট্টগ্রামের ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। এমবিবিএস শেষে দেশে ফিরে যাই। পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের জন্য আবার আসি, কারণ এখানে সরাসরি নিওনেটোলজিতে পড়ার সুযোগ আছে এবং ভাষাও জানা।’

বিপিএমসিএর উদ্যোগ

বিপিএমসিএর জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘গত বছর মালদ্বীপ ও নেপালে মেডিক্যাল এডুকেশন ফেয়ার করেছি। এ বছর ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কায় ফেয়ার করার ইচ্ছা আছে। বাংলাদেশে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও অনেকে পড়তে আসেন। শুধু শিক্ষা নয়, দেশ হিসেবে আমাদের মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং দরকার।’

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

সরকারি মেডিকেলে নন-সার্ক কোটায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাবদ প্রতিবছর পাঁচ হাজার ডলার দিতে হয়, অর্থাৎ পাঁচ বছরে ২৫ হাজার ডলার। বেসরকারি মেডিকেলে খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার ডলার। এই খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় সুযোগ থাকলেও শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় তা হ্রাস পাচ্ছে।