খুলনায় বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডে ইতিহাসভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত
খুলনা শহরে বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক একটি কুইজ প্রতিযোগিতা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ৩০ মার্চ নগরীর প্রগতি মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠে এই আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন বটিয়াঘাটা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সহকারী কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন কুমার রায়। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা এক গোলাপ ফোটানো দিন। দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রামে আমরা স্বাধীনতা এনেছি। তোমরাই গোলাপ, তোমরাই ফোটাবে গোলাপ। তোমাদের মেধা দিয়ে এ দেশকে গড়ে তুলবে।’
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি
বীর মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন কুমার রায় মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো স্মৃতিচারণা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘একাত্তরের ২৪ এপ্রিল চক্রাখালীতে একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। চক্রাখালী হাইস্কুলের সামনে কাজীবাছা নদীতে পাকিস্তানি দুটি গানবোট এসে ছিন্নভিন্ন করে গ্রামে নেমে পড়ে। চক্রাখালী, গল্লামারী, জলমা ইউনিয়নসহ কয়েকটি গ্রাম সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয়। ১৯ তারিখ বাদামতলায় গণহত্যায় ২০ জন লোক মারা যায়। ২০ মে চুকনগর গণহত্যায় ২০ হাজার লোক মারা যায়।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের সর্বশেষ যুদ্ধ হয় গল্লামারী বেতার কেন্দ্রে। ১৬ ডিসেম্বর এবং ১৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি যুদ্ধ হয়। ১৬ ডিসেম্বর সারা দেশে বিজয় হলেও খুলনা ১৭ ডিসেম্বরে মুক্ত হয়।’ এই বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো ফুটে উঠেছে।
শিক্ষক ও বন্ধুসভা নেতাদের বক্তব্য
প্রগতি মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত কুমার রায় বলেন, ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার সূত্রপাত। স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তান সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে বঞ্চিত ছিল। এ বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে এ দেশের সূর্যসন্তানেরা ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে দুঃখজনক হলো, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও স্বাধীনতার শোষক ও ঘোষক নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। প্রথম আলোকে সাধুবাদ জানাই এ ধরনের আয়োজনের জন্য।’
খুলনা বন্ধুসভার সভাপতি স্বর্ণকমল রায় বলেন, ‘আমরা বইয়ে পড়েছি মুক্তিযোদ্ধাদের কথা; কিন্তু তাঁদের সঙ্গে আমাদের খুব কমই দেখা হয়েছে। আজ সেই মুক্তিযোদ্ধাদের স্নেহের পদতলে বসে কথা বলতে পারছি, এটি অনেক বড় ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা ছিলাম একটি রাষ্ট্রের কাছে খেলার পুতুল, আমরা মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারতাম না। শত বাধা পেরিয়ে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে এনেছে লাল-সবুজের পতাকা।’
অনুষ্ঠানের কার্যক্রম ও পুরস্কার বিতরণ
অনুষ্ঠানটি ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এরপর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ৩০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় পাঁচজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়:
- প্রথম স্থান: মারজান
- দ্বিতীয় স্থান: সুদীপ্ত সানা
- তৃতীয় স্থান: ফারোয়া রহমান
- চতুর্থ স্থান: আবদুর রহমান
- পঞ্চম স্থান: আতিফা রহমান
বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই তুলে দেন অতিথিরা। অনুষ্ঠানে খুলনা বন্ধুসভার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রহমাতুল্লাহর সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন প্রগতি মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের সিনিয়র শিক্ষক আফজাল হোসাইন, তনুজা কবিরাজ, তাপসী মণ্ডল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন খুলনা বন্ধুসভার সভাপতি স্বর্ণকমল রায়।
অন্যান্য অংশগ্রহণকারী ও উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে বন্ধুদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক ফারজানা যুথি, সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত গাইন, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক দ্বীপ মণ্ডল, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক শ্রাবন্তী কুণ্ডু, বন্ধু আবু হানিফা, জান্নাতারা জান্নাতসহ অনেকে। এই আয়োজনটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



