রংপুর জিলা স্কুলে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ইতিহাস চর্চার আহ্বান
পৃথিবীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এই দেশের মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কখনোই ভুলে গেলে চলবে না, বরং ইতিহাস অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানের সূচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতা
শুক্রবার সকালে রংপুর জিলা স্কুলে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড–২০২৬’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রংপুর বন্ধুসভা। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে মার্চ মাসজুড়ে দেশব্যাপী এই আয়োজন পরিচালনা করছে প্রথম আলো বন্ধুসভা, যার লক্ষ্য নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তৎপরতা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়া।
সকাল ১০টায় পতাকা মঞ্চের সামনে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। রংপুরের তিন বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা ও আতিয়ার রহমান পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর একাডেমিক ভবনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৪ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। রংপুর বন্ধুসভার সভাপতি সোহেলী চৌধুরীর সঞ্চালনায় একটি আলোচনা অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের বক্তব্য ও অনুভূতি
বীর মুক্তিযোদ্ধা আতিয়ার রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘অনেক হতাশা ও দুঃখের মাঝেও আজকের এই অনুষ্ঠানে আমি আনন্দিত। যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসকে বিকৃত ও মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে, তখন এই আয়োজন আশার আলো দেখাচ্ছে।’ তিনি মাতৃভূমির সংজ্ঞা তুলে ধরে বলেন, ‘বাঙালি জাতি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে এবং দেশকে স্বাধীন করেছে। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এই মাতৃভূমি গড়ে তুলতে হবে।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার দইখাওয়াতে মুক্তিযুদ্ধের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কাছে মৃত্যু তুচ্ছ ছিল, আমরা দিনরাত সংগ্রাম করেছি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে উদ্ভূত হয়েছিল, এবং তরুণ প্রজন্মকে আশা করি তারা বাংলাদেশকে সুন্দর ও সমৃদ্ধিশালী করে তুলবে।’
শিক্ষাবিদদের পরামর্শ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
কারমাইকেল কলিজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল ওয়াহেদ শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত মনোযোগ দিয়ে গাইতে ও শুনতে উৎসাহিত করেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংগীতের প্রতিটি লাইনে দেশপ্রেমের কথা রয়েছে, যা গভীরভাবে অনুভব করা উচিত।’ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস অনুসন্ধানী হওয়ার পরামর্শ দেন, ‘তোমাদের নিজেদের পড়াশোনা ও গবেষণার মাধ্যমে সত্যকে খুঁজে বের করতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম প্রথম আলো বন্ধুসভাকে ধন্যবাদ জানান। অনুষ্ঠানে হারাগাছ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মারিয়া ইসলাম ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা…’ গানটি পরিবেশন করেন এবং ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া সিকান্দার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন।
কুইজ প্রতিযোগিতার ফলাফল ও পুরস্কার
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আজিজুল ইসলাম, দ্বিতীয় হন রংপুর সরকারি কলেজের তানভীর আহম্মেদ, তৃতীয় রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অপসরা ফেরদৌস, চতুর্থ ঝিনাইদহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কে এম গালিবুর রহমান এবং পঞ্চম হন সিটি ইউনিভার্সিটির মায়িশা মুনাওয়ারা। বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই উপহার দেওয়া হয়, এবং রংপুর বন্ধুসভার সদস্যরা এই আয়োজনে সহযোগিতা করেন।



