শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ: দলীয় বিবেচনা নিয়ে প্রশ্ন
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ

শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণায় উপাচার্য নিয়োগ: নতুন বিতর্কের সূচনা

দেশে সম্ভবত প্রথমবারের মতো একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার দায়িত্বে ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এই ঘটনাটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে শিক্ষামন্ত্রীর এ ধরনের ঘোষণা দেওয়ার এখতিয়ার আছে কিনা, বিশেষত যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা

১৭ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে পুরোনো ধারায় দলের অনুগত শিক্ষকদের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্যদের নাম ঘোষণা করেছেন, যাদের মধ্যে একজন সরাসরি বিএনপির পদে রয়েছেন এবং বাকি ছয়জন বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠনের সাবেক বা বর্তমান নেতা।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, "প্রত্যেক ভিসির বিষয়ে চেক করেছি। সব দেখে ক্যাটাগরি করে যারা ভালো পারফরম্যান্স করেছেন, তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।" রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি জবাব দেন, "একজন লোকের রাজনীতি করা কি অপরাধ? এটি কি তাদের ডিসকোয়ালিফিকেশন? এটা ডিসকোয়ালিফিকেশন নয়।"

নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা ও সংশ্লিষ্টতা

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, যিনি বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক এবং 'সাদা দল'-এর আহ্বায়ক।
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক।
  • চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি।
  • জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রইস উদ্দিন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক।
  • উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, সাদা দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক।

দলীয়করণের প্রবণতা ও জনমনে সংশয়

রাজনীতি করা অপরাধ নয়, কিন্তু যখন রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এমনকি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত হয়, তখন জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এই দফায় নিয়োগপ্রাপ্তদের সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার ও প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে দলীয় বিবেচনাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষামন্ত্রী যদিও বলেছেন যে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা হয়েছে এবং অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়: একই বা অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো শিক্ষক যদি ক্ষমতাসীন দলের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য না রাখেন, তাহলে তার পক্ষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়া সম্ভব কিনা। বিগত বছরগুলোতে ভিসি নিয়োগে দলীয়করণের যে চিত্র দেখা গেছে, তা দেশবাসীর অজানা নয়।

নিয়োগ প্রক্রিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে নির্বাচিত তিন সদস্যের প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী উপাচার্যদের নাম ঘোষণা করছেন, যা দলীয় কোনো কমিটি ঘোষণার মতো মনে হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও উপাচার্যদের মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ভিসি পদে দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ

অতীতে দেখা গেছে, প্রচুর দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক শুধুমাত্র দলীয় আনুগত্য না থাকার কারণে ভিসি বা প্রো-ভিসি হতে পারেননি। অন্যদিকে, দলীয় আনুগত্যের কারণে অনেক অসৎ, দুর্নীতিপরায়ণ ও অ্যাকাডেমিকভাবে দুর্বল ক্যারিয়ারের ব্যক্তিও বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে রাতের আঁধারে ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে এসেছেন, আবার কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত করতে হয়েছে।

আহমদ ছফার 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির মধ্যেই সেই প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে 'গোয়ালঘর' বানানোর প্রবণতা এখনও বিরাজ করছে কিনা, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

শিক্ষকদের মনোভাব ও ভিসি পদের আকর্ষণ

সব শিক্ষক ভিসি হতে চান না, কারণ ক্লাসে পড়ানো আর 'ভিসিগিরি' করার মধ্যে পার্থক্য অনেক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক ফেসবুকে লিখেছিলেন, "ভিসি হতে চাই না, পড়াতে চাই, পড়ানোর পরিবেশ তৈরি করুন।" ভিসি পদটি যদিও প্রশাসনিক, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করা তার প্রধান দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক ভিসি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি সহ নানা অভিযোগ উঠেছে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন শিক্ষার্থীদের পড়ানোর পরিবর্তে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য হতে বেশি আগ্রহী।" তার মতে, অনেক শিক্ষক ভিসি হতে চাইলেও তিনি সবসময় একজন ভালো শিক্ষক হতে চেয়েছেন, ভিসি হতে চাননি।

দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে ভিসি পদ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও প্রক্টর পদে নিয়োগ নিয়ে যে ধরনের রাজনীতি হয়েছে, তাতে এই পদগুলো দলীয় আনুগত্যের পুরস্কারে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্র ও টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে এই পদগুলোর ব্যবহার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরাট অংশের মনে ভিসি হওয়ার বাসনা তৈরি করেছে। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো নির্লোভ, সৎ ও আন্তরিক শিক্ষকের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যারা কোনোদিন এসব প্রশাসনিক পদে যেতে চাননি।

নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

একটি বিরাট অভ্যুত্থানের পর নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় মানুষের প্রত্যাশা স্বভাবতই বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গোয়ালঘর বানানোর প্রতিবাদে আহমদ ছফা যে 'গাভী বিত্তান্ত' লিখেছিলেন, সেই একই অবস্থা এখনও বিরাজ করবে কিনা, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসিরা পূর্বসূরীদের মতো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লাম্পট্যের স্রোতে গা ভাসাবেন কিনা, তা জনমনে উদ্বেগের কারণ।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বলয়ে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার পরেই তারা প্রথমত সেই ক্ষমতা নিজের ও পরিবারের আর্থিক উন্নয়নে কাজে লাগিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল না। তাদের প্রধান আগ্রহ ছিল অবকাঠামো নির্মাণ, কেনাকাটা ও নিয়োগের মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পদত্যাগের ঘটনা

এই পদগুলো এতটাই দলীয়করণ করা হয়েছে যে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টর, কোষাধ্যক্ষসহ শীর্ষ পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারাও পদত্যাগ করেন। যেহেতু তারা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং দলীয় আনুগত্য আছে এমন লোকদেরই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ফলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তারা পদত্যাগ করেছেন। অনেক শিক্ষক এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে পারছেন না।

শেষ কথা: নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতি প্রত্যাশা

শিক্ষক হলেও প্রত্যেকের একটা রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিশ্বাস যদি তাকে দলীয় কর্মীতে পরিণত না করে এবং তিনি যদি দায়িত্ব পালনকালে আর্থিকভাবে দুর্নীতিমুক্ত থাকেন, নিয়োগবাণিজ্য না করেন, দল-মত নির্বিশেষে সকলের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করতে পারেন, ক্যাম্পাসে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন, তাহলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোন দলের আদর্শ লালন করেন, সেটি হয়তো বিবেচনায় আসবে না। সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যরা আগের ভিসিদের মতো ক্ষমতার তোষণ ও টাকা কামাতে গিয়ে শিক্ষক পেশার মর্যাদাহানি করবেন না, এই প্রত্যাশা রইল।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।