সুইডেনের স্কুলে ডিজিটাল বিপর্যয়: বই ফিরছে, মনোযোগ বাড়ছে
সুইডেনের স্কুলে ডিজিটাল বিপর্যয়, বই ফিরছে

সুইডেনের স্কুলে ডিজিটাল বিপর্যয়: বই ফিরছে, মনোযোগ বাড়ছে

একসময় ডিজিটাল শিক্ষার জন্য প্রশংসিত সুইডেন এখন প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করছে। দেশটির স্কুলগুলো ডিজিটাল পদ্ধতি বাদ দিয়ে আবার পুরোনো দিনের বইভিত্তিক পড়াশোনায় ফিরছে। গত এক দশকে ল্যাপটপ ও ট্যাবলেটের মাধ্যমে আধুনিকীকরণের চেষ্টা সত্ত্বেও, শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা ও গভীর মনোযোগ কমে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কীভাবে সমস্যা তৈরি করল?

২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সুইডেনের স্কুলগুলো থেকে বই সরিয়ে ল্যাপটপ ও আইপ্যাড চালু করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ক্লাসরুমকে আধুনিক করে শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। কিন্তু ফলাফল হয়েছে বিপরীত। গবেষণায় দেখা গেছে, ডিভাইসে বেশিক্ষণ থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ার ক্ষমতা ও মনোযোগ কমে গেছে। হাতে লেখার বদলে কি-বোর্ডে টাইপ করায় তাদের মনে রাখার ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে।

এ ছাড়া, পড়াশোনার চেয়ে গেম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে ঝোঁক বেড়ে যাওয়ায় ক্লাসের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে, যা পরীক্ষার ফলাফলেও প্রভাব ফেলেছে। ২০১২ সালে পিসা পরীক্ষায় সুইডেনের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ার মান, গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এই সংকট সমাধানেই এখন বই আবার ক্লাসরুমে ফিরে এসেছে।

বই ফেরানোর উদ্যোগ ও ইতিবাচক ফল

সুইডিশ সরকার এখন ডিভাইসের বদলে বইয়ের ওপর জোর দিচ্ছে। গত বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঠ্যবই ও শিক্ষকদের জন্য নির্দেশিকা তৈরিতে প্রায় ৬২ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য গল্প ও তথ্যের বই কিনতে আরও ৪০ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হলো, খুব ছোট বাচ্চাদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। শুধু বড় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিতভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

এই পরিবর্তনের ফল ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মান আবারও উন্নত হচ্ছে, এবং ১০ বছর বয়সীদের জন্য দেশজুড়ে বই পড়ার প্রতিযোগিতা চালু করা হয়েছে। একটি বই হাতে ধরে পড়ার অনুভূতি স্ক্রিনের চেয়ে ভিন্ন; কাগজের পাতায় শব্দ দেখা ও পাতা ওলটানোর মাধ্যমে গভীর মনোযোগ তৈরি হয়।

শিক্ষকদের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকেরা বলছেন, কাগজের বইয়ের বদলে স্ক্রিনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাই এই সমস্যার মূল কারণ। এ ছাড়া শিক্ষকদের সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা তুলে দেওয়াকেও দায়ী করা হচ্ছে। দক্ষিণ সুইডেনের লিনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিন্ডা ফালথ জানান, ২০২৮ সাল থেকে দেশজুড়ে একটি নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হবে, যার মাধ্যমে সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে শিশুদের সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে পড়তে শেখানোর জন্য।

ডিজিটাল যুগের আগে শিক্ষকেরা যেভাবে জোরে শব্দ করে পড়াতেন, সেই পদ্ধতি এখন আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এর ফলে ক্লাসের প্রত্যেক শিশু ভালোভাবে পড়তে পারছে, যা সুইডিশ ভাষার পাশাপাশি গণিত, বিজ্ঞান ও ভূগোলের মতো বিষয় বুঝতেও সহায়ক হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো সুইডেনের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি টেকসই পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।