শিক্ষক কবি শামীম রেজা: বিশ্বসাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এক অনন্য পথপ্রদর্শক
"এই জীবনব্রজের মাঝপথে চারিণীখুঁজে পাই আমি নিজবোধ এই আঁধার বিলীন বনে, সরল সরণি হারালো যেখানে তীর।"—দান্তে। বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত আঙিনায় রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়ড, ওডেসি কিংবা মেঘনাদবধ কাব্যের মতো মহাকাব্যের জটিল আখ্যানগুলোর গিঁট খুলে সেগুলোকে নতুন করে সহজ ও সুসংবদ্ধ পাঠ আমরা পেয়েছি আমাদের শিক্ষক কবি শামীম রেজার কাছে। তাঁর ক্লাসে বাদ যায়নি আরব্য রজনীর গল্পভুবনের বিস্ময়কর রহস্যও। কবি হিসেবে তিনি বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্যজগতে সুপরিচিত ও নন্দিত ব্যক্তিত্ব; অন্যদিকে শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে বিশ্বসাহিত্য ও বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রবেশদ্বার স্বরূপ হয়ে উঠেছিল।
একটি প্রজাপতির মাধ্যমে প্রকাশিত সংবেদনশীলতা
আমরা ৪৯তম আবর্তন যখন শিক্ষানবিশ হিসেবে ইনস্টিটিউটে প্রবেশ করি, তখন তিনি ইনস্টিটিউটের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। শুরু থেকেই তাঁকে দেখেছি বহুবিধ দায়িত্ব ও কর্মব্যস্ততার ভেতর নিরন্তর নিমগ্ন একজন মানুষ হিসেবে। কিন্তু সেই ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর সংবেদনশীলতা ও সূক্ষ্ম সচেতনতার পরিচয় মিলেছিল ক্লাসরুমের এক ছোট্ট ঘটনায়। শীত তখন ধীরে ধীরে কুয়াশার চাদর গুটিয়ে নিচ্ছে, চারদিকে নেমে এসেছিল এক মৃদু উষ্ণতার আবেশ। এমন এক সকালের ক্লাসে আমরা মনোযোগ দিয়ে লেকচার টুকে নিতে ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎই জানালার দিয়ে উড়ে এলো একটি প্রজাপতি। স্যার সঙ্গে সঙ্গেই সব ফ্যান বন্ধ করে দিতে বললেন, যেন প্রজাপতিটি নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যেতে পারে। সেই মুহূর্তেই উপলব্ধি করেছি, ক্লাসরুমে উপস্থিত প্রতিটি প্রাণের প্রতিই তাঁর দৃষ্টির পরিসর কতটা সতর্ক ও বিস্তৃত ছিল।
প্রকৃতির সান্নিধ্যে অনন্য পাঠদান
ক্লাসরুমের চার দেয়ালের ভেতর তিনি যেমন পাঠদান করেছেন, তেমনি মাঝেমধ্যে কবিগুরুর শান্তিনিকেতনীয় আবহে প্রকৃতির সান্নিধ্যে গাছতলায়, কখনো পুকুরের ওপর ভাসমান বাঁশের মাচায়ও আমাদের পাঠশালা বসেছে। সেইসব আলোচনায় উঠে এসেছে কখনো সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনীতি ও ক্ষমতার গভীর পাঠ, আবার কখনো পরাবাস্তব কাব্যের জটিল জগৎ। তাঁর ক্লাসরুম মানেই যেন গল্পের এক অফুরান ভুবন। ঝুড়ি ঝুড়ি গল্পের প্রবাহের মধ্যে পাওয়া যেত জীবনবীক্ষা, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে ওঠা জীবনপাঠ। বরিশালের বিএম কলেজ থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সেখান থেকে সুদূর পাশ্চাত্যের নানান দেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে মেলামেশার তিক্ত কিংবা আনন্দঘন স্মৃতি, অগণিত আড্ডা কিংবা সাংবাদিক জীবনের সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা—সবই যেন অনায়াসে উঠে আসত ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে। জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি যেমন প্রায়ই বলতেন, মানুষের জীবনে অন্তত একজন-দুজন নিজের মানুষ থাকা জরুরি, তেমনি স্মরণ করিয়ে দিতেন—"মৌমাছি আর ভ্রমর একই ফুলে ঘুরে; কেউ জমায় মধু, কেউ ছড়ায় বিষ।" মানুষের স্বভাব ও সম্পর্ক বোঝার এর চেয়ে সহজ অথচ গভীর মন্ত্র আর কী হতে পারে!
বিশ্ব চলচ্চিত্রের সহযাত্রী হয়ে ওঠা
চলচ্চিত্রের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জগতের সঙ্গেও আমাদের ৪৯তম আবর্তনের প্রথম পরিচয় তাঁর হাত ধরেই। আমরা কখনো পরিভ্রমণ করেছি সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী-এর ধুলোমাখা নিও-রিয়ালিস্ট জগতে, কখনো প্রবেশ করেছি আকিরা কুরোসাওয়ার রশোমন-এর দ্ব্যর্থক ও ধূসর বাস্তবতায়। কখনো দেখেছি আব্বাস কিয়ারোস্তামির ক্লোজআপ-এর নির্মিত বাস্তবতার বিস্ময়, আবার কখনো আবিষ্কার করেছি আন্দ্রেই তারকোভস্কির ক্যামেরার গভীর কাব্যিক জগৎ। এইসব মুহূর্তে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার প্রচলিত সীমারেখা যেন ধীরে ধীরে ভেঙে যেত। তিনিও নেমে আসতেন আমাদের কাতারে—ডেস্কে বসে আমাদের সঙ্গে সমান আগ্রহে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলচ্চিত্র দেখতেন। আমরা সবাই মিলে হয়ে উঠতাম বিশ্ব চলচ্চিত্রের একনিষ্ঠ দর্শক ও পাঠক, আর শিক্ষক হিসেবে তিনি হয়ে উঠতেন আমাদের সহযাত্রী।
ব্যতিক্রমী মূল্যায়ন পদ্ধতি
তাঁর একাডেমিক মূল্যায়নের পদ্ধতিও ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। তৃতীয় বর্ষের এক ক্লাসে আচমকাই এসে বলেছিলেন, "যে যার পছন্দের একটি চলচ্চিত্র বা উপন্যাস নিয়ে তাৎক্ষণিক একটি রচনা লেখো—শর্ত একটাই, তা হতে হবে আমাদের একাডেমিক সিলেবাসের বাইরের কোনো টেক্সট।" মনে আছে, সেদিন আমি লিখেছিলাম আকিরা কুরোসাওয়ার তুলনামূলক কম আলোচিত চলচ্চিত্র ‘ড্রিমস’ নিয়ে। মূল্যায়নও করেছেন আদর্শ শিক্ষাগুরুর মতোই, যা আমাদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছিল।
কবি শামীম রেজা একজন সত্যিকারের পথপ্রদর্শক। কীভাবে সাহিত্য ও চলচ্চিত্র, জীবন অভিজ্ঞতার গল্প, চিন্তা ও অনুভূতি একত্রে উৎকৃষ্টতার উদাহরণ হতে পারে, তাঁর কাছ থেকে শেখা যায়। স্যার ক্লাসে সিলেবাসের বাইরে গিয়ে যেন বৃহত্তর কোনো সিলেবাস ধরতে চান। এই জীবন-দৃষ্টির ফলেই তাঁর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা চিরকাল অমলিন থাকবে, যেন বিশ্বসাহিত্য ও চলচ্চিত্রের সেই অমূল্য পাঠগুলো আমাদের জীবনের পথে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলতে থাকবে।
