ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে ভার্চ্যুয়াল পাঠচক্র করেছে খুলনা বন্ধুসভা
একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের লেখা 'ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও তাৎপর্য' বইটি নিয়ে একটি ভার্চ্যুয়াল পাঠচক্রের আয়োজন করেছে খুলনা বন্ধুসভা। এই অনুষ্ঠানের শুরুতে ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়, যা বাংলা ভাষার জন্য তাঁদের আত্মত্যাগের স্মরণে একটি আবেগময় মুহূর্ত সৃষ্টি করে।
পাঠচক্রের আলোচনা ও সদস্যদের মতামত
দপ্তর সম্পাদক আল রাইসার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই পাঠচক্রে বন্ধুসভার সদস্যরা বইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম সুসংগঠিত জাগরণ। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলিবর্ষণে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ কয়েকজন তরুণ শহীদ হন। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত পথেই বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা অর্জন করে, যা বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
বন্ধু সৌরভ ঘোষ তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, 'ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও অধিকার রক্ষার এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। ভাষার জন্য এত বড় বলিদান আর কোনো জাতি দিয়েছে কি না, আমার জানা নেই। আমরা তরুণ প্রজন্ম আমাদের ভাষার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় আরও বেশি সচেষ্ট হব।' তাঁর এই মন্তব্য পাঠচক্রে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নতুন প্রেরণা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।
অন্যদিকে, বন্ধু অনির্বাণ সরকার বলেন, 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্ক থাকায় “ভাষা মতিন” নামে পরিচিত আবদুল মতিন, অন্যদিকে তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ও বামপন্থী লেখক আহমদ রফিক রচিত “ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য” বইটিতে ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাস, পটভূমি ও বাঙালির জাতীয়তাবাদের উন্মেষ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।' এই আলোচনা বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
সভাপতির বক্তব্য ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারী
খুলনা বন্ধুসভার সভাপতি স্বর্ণকমল রায় পাঠচক্রে তাঁর বক্তব্যে বলেন, 'আজকের এদিনে আমরা ইংরেজি ভাষাকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজেদের মাতৃভাষাকে আপন করে নেব। বাংলা ভাষার তাৎপর্য ও ইতিহাস গ্রন্থটি তোমরা এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছ, যার ফলে আমার কাছে গল্পটি ছবির মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে।' তাঁর এই উক্তি বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়।
পাঠচক্রে আরও উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক ফারজানা যুথি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমন মিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক তুহিন বাওলিয়া, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক হাসিবুর রহমান, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক দ্বীপ মণ্ডল, কার্যনির্বাহী সদস্য ফারিহা ঝিলাম, বন্ধু সাদিয়া আক্তার, এম এম মাসুম বিল্যাহ, বিধান দেবনাথ, লিমা আক্তারসহ অন্যান্য সদস্যরা। তাঁদের উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানকে আরও সমৃদ্ধ ও সফল করে তোলে, যা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।
এই ভার্চ্যুয়াল পাঠচক্রের মাধ্যমে খুলনা বন্ধুসভা শুধুমাত্র একটি বই নিয়ে আলোচনাই করেনি, বরং বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও মর্যাদা রক্ষায় তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার একটি কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলার একটি অনন্য উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত।
