মুসলিম শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হতে চায় তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়ার আজকার গল্পে উঠে এলো সাফল্য
মুসলিম শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হতে চায় তুরস্ক

মুসলিম বিশ্বের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হতে চায় তুরস্ক

মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে চাইছে তুরস্ক। দেশটির শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নেওয়া নানা পরিকল্পনার সুফল ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের পাশাপাশি শিক্ষার মান, ভৌগোলিক নিকটতা এবং তুলনামূলক স্বল্প ব্যয়ের কারণে তুরস্কে মুসলিম শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার আজকার স্বপ্নযাত্রা

ইন্দোনেশিয়ার আজকা মৌওলা ইসকান্দার মুদা তুরস্কের ইস্তাম্বুলের নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কোচ ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করছেন। ২৬ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থীর লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তিনি বলেন, 'আমার লক্ষ্য অনেক বড়। আমি কম্পিউটিংয়ের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে চাই।' সেই স্বপ্ন পূরণ করতে ভবিষ্যতে এনভিডিয়া, ইন্টেল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চান তিনি।

আজকা মুদা জানান, ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ থাকলেও তিনি স্নাতক ডিগ্রির জন্য বেছে নিয়েছিলেন আংকারার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (মেটু)। তাঁর ভাষায়, শিক্ষা ব্যয় একই হলেও মেটুতে গবেষণার সুবিধা বেশি ছিল। মেটুতে করা তাঁর গবেষণা নিবন্ধ কোচ ইউনিভার্সিটির নজরে পড়ে এবং ফলস্বরূপ তিনি পূর্ণ বৃত্তি পান।

বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি

তুরস্কে এ রকম শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। বর্তমানে দেশটিতে শুধু ইন্দোনেশিয়া থেকেই পড়ছে ৫ হাজার ৪৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী, যা গত এক দশকে বেড়েছে প্রায় ৬৫৫ শতাংশ। পাকিস্তানি শিক্ষার্থীর সংখ্যা একই সময়ে চার গুণ বেড়ে ৬ হাজার ৭৫ ছাড়িয়েছে। তুরস্কের উচ্চশিক্ষা পরিষদ (ওয়াইওকে) জানাচ্ছে, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত ১০ বছরে বেড়েছে ২৫১ শতাংশ। শুধু ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এই সংখ্যা পৌঁছেছে রেকর্ড ৩ লাখ ৭৯ হাজারে।

২০১৩ সালে তুরস্কে বিদেশি শিক্ষার্থীর হার ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে এখন ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে। তুরস্কের লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৫ লাখে উন্নীত করা এবং পরবর্তী সময়ে তা দ্বিগুণ করা।

শিক্ষার্থী টানার প্রতিযোগিতায় তুরস্ক

ওয়াইওকের সভাপতি এরল ওজভার বলেন, তুরস্ক এখন শিক্ষার্থী টানার প্রতিযোগিতায় মালয়েশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের সঙ্গে সমানতালে চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, তুরস্কে বিদেশি শিক্ষার্থীর ৮০ শতাংশই আসে মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ থেকে। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং ১৪ শতাংশ আফ্রিকার দেশগুলো থেকে।

ওজভার বলেন, 'ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনই তুরস্কে মুসলিম শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার মান, ভৌগোলিক নিকটতা ও তুলনামূলক স্বল্প শিক্ষাবয়সও শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করছে।'

বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে তুরস্কের অবস্থান

২০২৬ সালের টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংয়ে তুরস্কের চারটি বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ৫০০–এর তালিকায় আছে। সেগুলোর মধ্যে সবার ওপরে কোচ ইউনিভার্সিটি, তারপর মেটু ও ইস্তাম্বুলের বেসরকারি সাবাঞ্জি ইউনিভার্সিটি। শীর্ষ ১০০০–এর তালিকায় তুরস্কের ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

বিদেশে থেকে তুরস্কে পড়তে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যায় ৬৫ হাজার ৮৮৪ জন শিক্ষার্থী নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে তুর্কমেনিস্তান, যা মোট বিদেশি শিক্ষার্থীর ১৭ শতাংশের বেশি। এরপরেই আছে সিরিয়া, আজারবাইজান, ইরান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান।

আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ওজভার জানান, দক্ষিণ এশিয়া, আসিয়ান ও পূর্ব এশিয়া থেকে আরও শিক্ষার্থী আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তুরস্ক। কারণ, উচ্চশিক্ষার চাহিদা এই অঞ্চলগুলোতে দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা চুক্তি করেছে তুরস্ক।

এ ছাড়া তুর্কি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি সংগঠনগুলো আজারবাইজান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানে একাডেমিক ইউনিট খুলেছে। ইরাক ও পাকিস্তানেও একই পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।

অর্থনৈতিক অবদান ও চ্যালেঞ্জ

গত বছরের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জানান, বিদেশি শিক্ষার্থীরা তাঁদের ৯৫ শতাংশ টিউশন, বাসস্থান ও অন্যান্য ব্যয় নিজেরাই বহন করেন এবং তাঁরা তুরস্কের অর্থনীতিতে বছরে ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলার অবদান রাখে।

তবে কিছু শিক্ষাবিশেষজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি মান কমিয়ে বেশি শিক্ষার্থী নেওয়ার সমালোচনা করেন। শিক্ষাবিশেষজ্ঞ ও লেখক আব্বাস গাচলু বলেন, ফি-নির্ভর আকর্ষণ থাকলেও ভর্তি মানোন্নত করা গেলে শিক্ষার মানও বাড়বে। তিনি জানান, শিক্ষার্থীর মান নিশ্চিত করতে তাঁরা টিআর-ওয়াইওএস নামে নিজেদের বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা ব্যবহারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উৎসাহিত করছেন।

ভাষা ও সাংস্কৃতিক সংযোগ

বর্তমানে তুরস্কে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ৭৫ শতাংশ তুর্কি ভাষায় পড়ানো প্রোগ্রামে ভর্তি হন। আর ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেন। তুরস্কের সরকার ইংরেজি কারিকুলামে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়াতে চায়। তুর্কি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের প্রথমে এক বছর ভাষা কোর্স করতে হয়। এরপর চার বছরের স্নাতক ক্লাস শুরু হয়।

তুর্কি ও অন্য তুর্কিক ভাষা দক্ষিণ ককেশাস, মধ্য এশিয়া, বলকান ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বজুড়ে তুর্কি টিভি নাটকের জনপ্রিয়তাও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। মধ্য এশিয়ার মতো মধ্যপ্রাচ্য থেকেও তুরস্কে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী আসেন। বিশেষ করে সিরিয়া, ইরান, ইরাক, মিসরসহ অন্যান্য দেশ থেকে।

ইস্তাম্বুলের রাষ্ট্রীয় ইয়িলদিজ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিলাল হাসান জানান, তাঁর সবচেয়ে বড় সমস্যা ভাষা। কোর্স ইংরেজিতে হলেও অনেক অধ্যাপক মাঝেমধ্যেই তুর্কিতে ফিরে যান। তাই তুর্কি ভাষা জানা জরুরি।

একটি নিরাপদ বিকল্প হিসেবে তুরস্ক

ওজভার বলেন, যেসব শিক্ষার্থী ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারছেন না, তাঁদের জন্য তুরস্ক 'একটি নিরাপদ ও মানসম্মত বিকল্প'। সেই লক্ষ্যেই তাঁরা আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলায় অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছেন এবং জোরেশোরে ডিজিটাল প্রচার চালাচ্ছেন।

ইরানের আজারবাইজানি তুর্কিক জনগোষ্ঠীর সদস্য সামার কাজেমিনেজাদ জানান, তুরস্ক তাঁর কাছে অনেকটা নিজের বাড়ির মতোই। তিনি বলেন, 'তুরস্ক আমার কাছে নিজের ঘরবাড়ির মতোই। ইস্তাম্বুল থেকে ইরানে যেতে মাত্র তিন ঘণ্টার ফ্লাইট। সংস্কৃতি, জীবনের খরচ, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সবই আমাদের দেশের মতো।'